হাটহাজারীর প্রসিদ্ধ মিষ্টি মরিচ

Health 34

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এখানকার বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু ও মাটির তারতম্য এবং বীজের কারণে একেক জায়গায় একেক ফসল ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারীর লাল মিষ্টি মরিচ তেমনই একটি উল্লেখযোগ্য ফসল- যা ইতিমধ্যে দেশের গন্ডি পেরিয়ে দেশের বাইরেও পরিচিতি লাভ করেছে। তরকারি রান্নায় স্বাদ, গন্ধ ও রংয়ের কারণে এ বিশেষ মরিচটির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। বলা যায় হাটহাজারী লাল মিষ্টি মরিচের রং, ঘ্রাণ ও স্বাদের ভিন্নতার কারণে এটি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা অনেকের মতে, মিষ্টি মরিচ বলতে মূলত স্বাদগত মিষ্টি নয়, মরিচটির অসাধারন ঘ্রাণের কারণেই মিষ্টি মরিচ নামে খ্যাতি পেয়েছে। এটি আসলে মিষ্টি ঘ্রাণের কম ঝালযুক্ত মরিচ। এধরণের সু-ঘ্রাণ আর আর্কষণীয় রংয়ের কারণেই মরিচটির স্থানীয়ভাবে, জাতীয় পর্যায়ে তথা দেশের বাইরেও কদর বেড়েছে। জানা যায় বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে হাটহাজারীর ঐতিহ্যবাহী লাল মিষ্টি মরিচের গুড়া। হাটহাজারীর মরিচ দিয়ে রান্না করা তরকারি অত্যন্ত সুস্বাদু হয় এবং দেখতেও সুন্দর হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় হাটহাজারীর লাল মিষ্টি মরিচ ব্রিটিশ আমল থেকে গৃহিণী ও রন্ধনশিল্পীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাটজারীর মিষ্টি মরিচের আরেকটি গুণ হলো কাঁচা মরিচ দিয়ে চাটনি/সালাত স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। এ মরিচের রঙ শুকনো অবস্থায় আকর্ষণীয় লাল ও কাঁচা অবস্থায় হলুদাভ সবুজ হয়। আরো একটি কারণে হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচ বিখ্যাত তা হলো; দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর অববাহিকায় চাষ হয় এই মরিচ। এটি অনেক জায়গায় 'হালদা মরিচ' নামেও পরিচিত। যারা ঝাল কম খান তারা এই মরিচ কেনার জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন। স্থানীয় কৃষকেরা জানান হাটহাজারীর বেলে-দোআঁশ মাটি এবং এখানকার জলবায়ুতে এ মরিচের চাষাবাদ হয় বলেই ফলন বেশ ভালো ও গুণাগুণ সম্পন্ন হয়। শুধু হাটহাজারী নয় হালদা নদীর অববাহিকায় এ জাতের মরিচ পার্শ্ববর্তী রাউজান ও ফটিকছড়ি উপজেলাতেও চাষাবাদ হয়। রাউজান ও ফটিকছড়ি উপজেলাতে একই বীজের মরিচচাষ হলেও হাটহাজারীর মরিচেরই কদর বেশি। হাটহাজারীর মরিচ কেনার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা ছুটে আসে। সরেজমিন হাটহাজারী বাজারের মরিচহাটে দেখা যায় অন্যান্য মরিচের তুলনায় হাটহাজারীর মরিচের দাম প্রায় দ্বিগুণ, তবুও গ্রাহকের নিকট এর চাহিদা বেশী। হাটহাজারী সদরের কাছারি সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় হাটহাজারীর মরিচ বিক্রি হতো বলে এ জায়গাটি 'মরিচহাটার গলি' নামে খ্যাতি পায়। হাটহাজারী বাজারে প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার মরিচহাটার গলিতে হাটহাজারীর মরিচ বিক্রি হয়ে থাকে। শীতমৌসুমে বিশেষ করে চট্টগ্রামের মানুষ এ মিষ্টি মরিচের চারা কেনার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। মৌসুমের সময় পার্শ্ববর্তী উপজেলা; ফটিকছড়ি, রাউজান, সীতাকু-, মিরসরাই, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বাঁশখালি ও পটিয়া অঞ্চলের চাষিরা মিষ্টি মরিচের বীজ/চারা কিনতে হাটহাজারী বাজারে ভিড় জমান। সাধারণত: মরিচটি মধ্যম ঝাল ও পুষ্ট দানা বিশিষ্ট হয়। হাটহাজারী উপজেলার মন্দাকিনী, ছিপাতলী, নাঙ্গলমোড়া, মার্দাশা, মেখল, গুমান মর্দ্দন, গড়দুয়ারা, পৌরসভার মোহাম্মদপুর, আলমপুর, চন্দ্রপুর ও চারিয়ায় এ মরিচের ব্যাপক চাষাবাদ হয়ে থাকে। বর্তমানে হাটহাজারী উপজেলায় প্রায় হাজারের বেশি চাষি মরিচ চাষাবাদের সাথে সম্পৃক্ত। সাধারণত: দেখা যায় অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে এ মরিচ রোপণ করা হয় এবং ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। এখানকার মরিচ গাছে গোড়াপচন রোগ না হলে খুবই ভালো ফলন হয়ে থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হাটহাজারী এলাকায় গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২১৫ হেক্টর জমিতে মরিচের চাষাবাদ হয় ২৫৮ মেট্রিক টন এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৮০ হেক্টরে উৎপাদন হয় ২১৬ মেট্রিক টন। আমরা জানি সাধারণত: দোআঁশ মাটি মরিচ চাষের জন্য উত্তম। বর্তমানে প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে মরিচচাষ সারা বছরই করা যায়। চারার বয়স ৪৫ থেকে ৬০ দিন হলে ফুল আসে এবং পরবর্তী ৬০ দিন পর মরিচ সংগ্রহ করা যায়। এখানকার কৃষক যুগ যুগ ধরে এতদাঞ্চলের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে দেশীয় পদ্ধতিতে মিষ্টি মরিচের চাষাবাদ ও বীজ সংরক্ষণ করে আসছিল। মৌসুম শেষে তারা শেষ ‘জো’ এর মরিচটি ভালভাবে গাছপাকা করে বীজের জন্য আলাদা করে রাখতেন। অগ্রহায়নের শুরুতে কিংবা আশ্বিন মাসে বৃষ্টি কমে আসলে উঁচু জায়গায় বীজতলায় চারা জাগানো হয়। বীজতলা থেকে হৃষ্টপুষ্ট দেখে চারা তুলে আঁটি বেঁধে নেয়া হয় জমিনে কিংবা বাজারে। এ সকল চারা স্থানীয় কৃষেকরা নিজেরা চাষ করেন এবং আশ-পাশ উপজেলার কৃষকদের কাছেও বিক্রি করেন। মাঝখানে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিডের আগ্রাসন, অধিক মুনাফার হাতছানি এবং স্থানীয়দের অসচেতনতার কারণে একসময় এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যময় মরিচ হারিয়ে যেতে বসে। এছাড়াও চাষাবাদে ব্যয়বৃদ্ধি এবং আবাদি জমির সংকটের কারণেও অনেক কৃষক মরিচচাষে আগ্রহ হারাতে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষিব্যবস্থার প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে সনাতন চাষাবাদ ব্যবস্থায় নতুন সমস্যার উদ্ভব, কৃষকের অজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব এবং অতিরিক্ত ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আশাব্যঞ্জক ফলন বাধাগ্রস্থ হয়। এছাড়াও বর্তমান প্রচলিত বাজার ব্যবস্থায় দেখা যায় ফড়িয়াদের উৎপাতসহ নানা অনিয়ম ও বিভিন্ন ধরণের বাধার কারণে কৃষকেরা সঠিক মূল্য না পেয়ে লোকসান গুনে থাকে। যার ফলে কৃষকেরা শ্রমের সঠিক মূল্য না পেয়ে জীবিকা সংকটে পড়ে এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি মরিচচাষে ক্রমশ নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। এধরণের সংকটময় পরিস্থিতিতে স্বাদে-গুনে অনন্য এ বিশেষ মসলা জাতীয় ফসলটি অস্তিত্ব হারাতে বসে। পিকেএসএফ এর সহায়তায় ঘাসফুল ২০১৭ সালে জুলাই মাস থেকে হাটহাজারীতে “নিরাপদ সবজি ও মসলা জাতীয় ফসলের বাজার উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকের আয়বৃদ্ধিকরণ” বিষয়ক ভ্যালু চেইন উন্নয়ন উপ-প্রকল্পের আওতায় অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় লাল মিষ্টি মরিচ চাষাবাদ ও উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রকল্পটির আওতায় কৃষকদের ক্লাস্টারভিত্তিক পরিকল্পিত উপায়ে বাণিজ্যিকভাবে নিরাপদ সবজি ও মসলা জাতীয় ফসলচাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত মোট তিন হাজার কৃষককে নিরাপদ সবজি ও মসলা জাতীয় ফসলচাষে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন সমস্যার প্রযুক্তিগত ও বাস্তবভিত্তিক সমাধানের কাজ চলমান রয়েছে। ভ্যালু-চেইন উপ-প্রকল্পটিতে উৎপাদিত হাটহাজারী লাল মিষ্টি মরিচকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপননের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ঘাসফুল বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের কার্যক্রম সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এ প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে স্থানীয় কৃষকদের নিরাপদ উপায়ে মরিচের অধিক উৎপাদন, ভাসমান পদ্ধতিতে শাক-সবজি চাষ, উপযুক্ত/বৈজ্ঞানিক উপায়ে বীজ সংরক্ষণ, রোগমুক্ত চারা উৎপাদন, ফসলের প্রযুক্তিনির্ভর পরামর্শ এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত- করণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, স্থানীয় কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। জনপ্রিয় হাটহাজারী মিষ্টি মরিচকে জাতীয়ভাবে পরিচিত করে তুলতে ইতিমধ্যে ভিডিও ডুকুমেন্টারি তৈরি করা হয়েছে, দেশ-বিদেশের যে কোন প্রান্তে অনলাইনে মরিচ ক্রয়ের চাহিদা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাজারজাতকরণ প্রকল্পের সহায়তায় স্থানীয় ভাবে আধুনিক উপায়ে মরিচের গুড়া তৈরিসহ প্যাকেটজাতকরণ, গুদাম-জাতকরণ এবং সহজ ও সুলভমূল্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপকভাবে সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আশা করা যায় মরিচের এই জনপ্রিয় জাতটি দেশে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে। এতে করে স্থানীয় মরিচটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে, কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পেয়ে লাভবান হবে, দেশে ভেজাল মুক্ত ও নিরাপদ একটি পণ্য পাওয়া যাবে, এমনকি এ ব্যবসাকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্য থেকে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে। ঘাসফুল শুধু স্থানীয় লাল মিষ্টি মরিচ নয় এলাকায় নিরাপদ সবজি উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণেও নানারকম সৃজনশীল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। হাটহাজারী উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা জনাব শেখ আব্দুল্লাহ ওয়াহেদ বলেন, “হাটহাজারীর লাল মিষ্টি মরিচ নিঃসন্দেহে একটি গুণাগুণসম্পন্ন ভাল মরিচ। মরিচের গুড়া করলে কেজিতে ৮০০-৮৫০ গ্রাম গুড়া পাওয়া যায় যা অন্যান্য মরিচের তুলনা ১০০-১৫০ গ্রাম বেশি। ব্যাপক পরিসরে বাজারজাত সম্ভব হলে মরিচটির সম্ভাবনা অনেক। আমরা চেষ্টা করছি এ মরিচের ঐতিহ্য ধরে রাখতে। তার জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এক্ষত্রে উন্নয়ন সংস্থা ঘাসফুল এর উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। গত এক বছর ধরে ঘাসফুল PACE প্রকল্পের আওতায় যেসব কর্মসুচি হাতে নিয়েছে-তা প্রসংশনীয়। আমি তাদের কর্মকান্ডের সাথে নিজেও সম্পৃক্ত আছি। আশা করছি, তাদের চলমান কর্মকান্ড অব্যাহত থাকলে হাটহাজারীর লাল মিষ্টি মরিচ যথাযথ মর্যাদা ফিরে পাবে। ঘাসফুল বাস্তবায়নাধীন চঅঈঊ প্রকল্পের সমন্বয়কারী কৃষিবিদ মো: বোরহান উদ্দিন জানান, “আগামীতে প্রকল্পের কর্মকান্ডে এধরণের উদ্যোগের মাধ্যমে মিষ্টি মরিচ বাজারজাতের পাশাপাশি হলুদ, গোলমরিচ, ধনিয়া, জিরা এবং ড্রাগন ফল, অ্যাভোকাডো, হাইব্রিড নারিকেল এবং কফিও অর্ন্তভুক্ত করা হবে। বাজারজাতকরণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এসব কৃষি পণ্যের কালেকশান সেন্টার স্থাপন এবং সুবিধাজনক বিভিন্ন স্থানে বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মতামত অনুযায়ী আশা করা যায় এ সকল উদ্যোগ গুলোর মাধ্যমে হাটহাজারী মিষ্টি মরিচের গুড়া ভবিষ্যতে একটি বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে ইমেজ গড়ে তুলে ভোক্তাদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে। এতে করে একদিকে যেমন নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে ভুমিকা রাখবে তেমনি স্থানীয় ভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে। দারিদ্র বিমোচনের পাশাপাশি কৃষি উন্নয়ন ও কর্ম-সংস্থান সৃষ্টি সর্বোপরি এই বিশেষ প্রজাতির মরিচটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। আমরা জানি গুড়ামরিচ বাজারজাতকরণে বর্তমানে বাংলাদেশের বেশ কিছু বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মসলা জাতীয় পণ্য প্রক্রিয়া জাতকরণের মাধ্যমে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সফলতার সাথে বাজারজাত করছে। সরেজমিনে দেখা যায় এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কৃষকদের দাদন দিয়ে কিংবা এজেন্ট নিয়োগ করে স্থানীয় বাজার হতে কাঁচামাল সংগ্রহ করে থাকে। বিশেষ করে হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচটির প্রতি তাদের নজরদারি রয়েছে। কারণ ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টি মরিচ চট্টগ্রামসহ ঢাকা শহরে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে বর্তমানে এই মরিচের গুড়া স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করে স্থানীয় ভাবেই বাজারজাত করা হয়। এসব কোম্পানী সীমিতকারে প্যাকেটজাত করে বিক্রি শুরু করলেও বাজারে তা পর্যাপ্ত নয়। এছাড়াও সাধারণ অনেক গৃহস্থ বা আগ্রহী ক্রেতাগণ স্থানীয় বাজার হতে লাল মরিচ সংগ্রহ করে নিজেরাই মিলে গুড়া করে থাকে। আবার দেখা যায় বাজারের গুড়া লাল মরিচের সাথে ইটের গুড়া কিংবা অন্য জাতের মরিচের গুড়া মিশিয়ে এবং বিভিন্ন ধরণের অসাধু উপায়ে ওজন বৃদ্ধি করার ফলে স্বাদে ও গুনগতমানের দিক থেকে তা নিন্মশ্রেনীর  হয়ে থাকে। অনেক সময় তাতে ক্রেতাদের আস্থা সংকটের মুখেও পড়তে হয়। ঘাসফুল বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে এ মরিচের মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। আশা করা যায় উদ্যোগগুলো সফলতার মুখ দেখবে। PACE প্রকল্পের সহকারী টেকনিক্যাল অফিসার জনাব মোঃ মহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা হাটহাজারী লাল মিষ্টি মরিচকে ব্র্যান্ডিং করার লক্ষে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য প্রর্দশনী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে, সমস্যাভিত্তিক আলোচনা করছি, ব্যাপকভাবে প্রচারের জন্য বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। পিকেএসএফ কর্তৃক প্রণীত প্রকল্পের ধারণাপত্রেও দেখা যায় বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপশি বিকল্প বাজার সংযোগ স্থাপনেরও উদ্যোগ রয়েছে। তাই ভ্যালু চেইন কর্মকা-ের আওতায় মরিচ প্রক্রিয়াজাতকরণ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়তা করা গেলে এ সাব-সেক্টরে প্রতিযোগীতা সৃষ্টি সম্ভব হবে নিশ্চিত। কৃষকদের নতুন নতুন প্রযুক্তি, বাজার তথ্য এবং অনুবিদ্ধ সেবা প্রাপ্তি সহজ হবে। নিজস্ব সাপ্লাই চেইনের পাশাপাশি পিকেএসএফ-এর প্রকল্পের আওতায় ই-কমার্স সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্যের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বাজারে ব্রান্ডিং ও বাজারজাতকরণ করার পরিকল্পনার বিষয়টিও ধারণাপত্রে রয়েছে। পিকেএসএফ প্রণীত চঅঈঊ প্রকল্পের ধারণাপত্রে আরো দেখা যায় মরিচটি শুধু সু-স্বাদু নয় বরং বিভিন্ন গুণাগুণে ভরপুর। তার মধ্যে কিছু গুণাগুণ উল্লেখ করার মতো। গুণাগুন গুলোর মধ্যে রয়েছে;    -  এন্টিঅক্সিডেন্ট: কাঁচা মিষ্টি মরিচে পর্যাপ্ত পরিমানে ভিটামিন-সি থাকে যা একটি শক্তিশালী এন্টিঅক্সিডেন্ট। এন্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের ফ্রি রেডিকেলস ধ্বংশ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার সুরক্ষা প্রদান করে। এটি ক্যানসার কোষ সৃষ্টিতে বাধা প্রদান করে।    - শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সুরক্ষা: মিষ্টি মরিচ ভিটামিন কে-১ শরীরের কিডনী, হাড় এবং রক্তের কার্যকারীতা সচল রাখতে সাহায্য করে।    - শক্তি বিপাকে সহায়তা: মিষ্টি মরিচ ভিটামিন বি-৬ সমৃদ্ধ হওয়ায় তা শরীরের বিপাকীয় ক্রিয়ার জন্য ভূমিকা রাখে।    - হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো: এটিতে পর্যাপ্ত পটাশিয়াম থাকায় তা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।    -  বিটা ক্যারোটিন: লাল মরিচ বিটা কারোটিন সমৃদ্ধ বলে এটি ভিটামিন-এ এর অন্যতম উৎস হিসেবে কাজ করে।     - কাঁচা অবস্থায় এ মরিচে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি থাকে।    ধারণাপত্রে আরো বেশকিছু বিষয় উঠে আসে, যা পাঠকের অবগতির জন্য এখানে উল্লেখ করা যায়। আমরা জানি বাংলাদেশ একসময় খাদ্যশস্য ছাড়াও অর্থকরী ফসল হিসেবে খ্যাতি ছিল; সোনালি আঁশের পাট, রেশম এবং মসলা উৎপাদনে। উৎপাদিত এসব কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করেই এতদাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বিশ্ববিখ্যাত প্রাচ্যের ডান্ডি, সিল্করুট এবং স্পাইসরুট। মসলা চাষাবাদ কৃষিক্ষেত্রে একটি ভিন্নতর অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একসময় বাংলাদেশসহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ ‘মসলার দেশ’ নামেই পরিচিত ছিল। তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থায় জল পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ আমেরিকায়ও এ মসলা সরবরাহ করা হতো। বাংলাদেশে বর্তমানে হলুদ, মরিচ, আদা উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে। হলুদ ও আদার তুলনায় মরিচ উৎপাদন কম যা আমাদের চাহিদার তুলনায়ও অনেক কম। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব মসলা জাতীয় ফসল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চাষাবাদে বা সূসংহত বাণিজ্যিক ভিত্তি না থাকাতে আশানুরূপ উৎপাদন হচ্ছে না। ধারণাপত্রে দেখা যায় দেশে উৎপাদিত এসব মসলার মোট গড় উৎপাদন বছরে প্রায় ২০ লাখ টন, কিন্তু বছরে অভ্যন্তরীন চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩২.৫ লাখ টন। অতিরিক্ত ১২.৫ লাখ টনের চাহিদা পূরণ করতে প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার পিঁয়াজ, কালোজিরা ও দারুচিনিসহ বিভিন্ন মসলা পণ্য আমদানী করতে হয়। এর মধ্যে কেবলমাত্র মরিচ উৎপাদিত হয় ১২ লাখ টনের মত। দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রধানত ভারত থেকে বিপুল পরিমানে গুড়া মরিচ আমদানী করতে হয়। গত ২০১৬-১৭ অর্থ-বছরে শুধু ভোমরা স্থল বন্দরের মাধ্যমে ভারত হতে ৬,৩২০ মে. টন মরিচ আমদানী করা হয়। মরিচ হল মসলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা সারা বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। পিকেএসএফ কর্তৃক প্রনীত ধারণা পত্রে আরো উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশের মোট মরিচ চাষ কৃষকের মধ্যে প্রায় ২৩% কৃষক চট্টগ্রাম জেলার। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২০১৪-১৫ অর্থ-বছরে রবি ও খরিপ মৌসুমে মোট ৭২১৪ ও ১১৪ একর জমিতে মরিচ চাষ হয় এবং উৎপাদন যথাক্রমে ৭২১২ ও ৪০ মে.টন। প্রত্যেক ফসলের জন্য দেশের কিছু বিশেষ অঞ্চল সমাদৃত তদ্রুপ চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী অঞ্চলও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি মিরিচ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। এই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নভুক্ত গ্রামে সবজির পাশাপাশি বেশী পরিমানে মরিচ উৎপন্ন হয়ে থাকে। হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এরকম অসংখ্য বিশেষ গুণাগুণসম্পন্ন শষ্য রয়েছে যা এখনো অজ্ঞাত রয়ে গেছে। এজন্য শুধু হাটহাজারী নয় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে উৎপাদিত বিশেষ বিশেষ শষ্যগুলোকে চিহ্নিত করে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে যদি এভাবে সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া হয়, উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি নিশ্চিত করে উন্নত বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি একেকটি ব্র্যান্ডিং করা সম্ভব হয় তাহলে দেশিয় বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকেরা উপকৃত হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে জাতীয় স্বাস্থ্যরক্ষায় যেমন ভূমিকা রাখবে তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এধরণের প্রকল্প/কার্যক্রম দেশব্যাপি সম্প্রসারণে পিকেএসএফ বা সরকারি-বেসরকারি সংস্থা/দপ্তর/প্রতিষ্ঠান গুলোকে আরো বেশী মনোযোগী হয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া আবশ্যক।     

Topics:

হাটহাজারীর প্রসিদ্ধ মিষ্টি মরিচ

Login to comment login

Latest Jobs