Posted By

আনা ফ্রাঙ্কের যে কবিতায় কাঁপে পৃথিবী

Education 31

আনা ফ্রাঙ্কের নাম কারো কাছে অপরিচিত নয়। যারা মোটামুটি লেখাপড়া জানেন তাদের সবার কাছে ১৫ বছর বয়সী এ কিশোরী অমর হয়ে আছেন তার অবিস্মরণীয় ডায়েরিটির জন্য। যা আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি নামেই বিখ্যাত।

হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য তাদের পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল নিজেদের অফিস বাড়ির পেছনে এক গোপন আস্তানায়। কারণ তারা ছিল ইহুদি। আনার পরিবার ছাড়া সেখানে ছিল আরেকটি পরিবার। আনার বয়স তখন মাত্র ১৩। তার জন্ম হয় ১৯২৯ সালের ১২ জুন।

সেই গোপন আস্তানায় বসেই আনা লিখতে শুরু করে রোজকার দিনলিপি। পঁচিশ মাস থাকতে হয় তাদের সেই গোপন আস্তানায়। সেখান থেকে হিটলারের বাহিনী ১৯৪৪ সালের ৪ আগস্ট তাদের ধরে নিয়ে যায় বন্দি শিবিরে।

১৯২৯ সালের ১২ জুন আনা ফ্রাঙ্ক জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন বরেণ্য ব্যবসায়ী। কিন্তু মাত্র চার বছর যেতেই তাদের জীবনে নেমে আসে এক অসহনীয় দুর্ভোগ। ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় এসেই ইহুদিদের বিরুদ্ধে একের পর এক ব্যবস্থা নিতে থাকেন। তাই এখানে ব্যবসা বাণিজ্য করা ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার । 

তাই এই বছরই আনা ফ্রাঙ্কের বাবা অটো ফ্রাঙ্ক নেদারল্যান্ডস-এর রাজধানী আমস্টার্ডমে ব্যবসাপাতি গুছিয়ে চলে যান। এখানে ছোট ব্যবসা হলেও অল্পতে বেশ গুছিয়ে নেন। এই সময়টাতে আনা ফ্রাঙ্ক তার দাদির সাথে জার্মানেই ছিল। ১৯৩৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনা ফ্রাঙ্ক আমস্টার্ডমে নিজ পরিবারের সাথে যোগ দেয় এবং ১৯৩৫ সাল থেকে স্কুলে যেতে শুরু করে। 

স্বভাবতই আনা ফ্রাঙ্ক ছিল বেশ বুদ্ধিমতী ও চতুর। মেধাবী হিসেবে স্কুলে তার বেশ একটা খ্যাতিও ছিল। কিন্তু তাদের নতুন জীবন খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ১৯৪০ সালের মে মাসে নেদারল্যান্ডস জার্মান নাৎসি বাহিনীর দখলে আসে। 

খুব দ্রুতই হিটলারের বাহিনী জনজীবন বিপর্যস্ত করে তোলে, বিশেষত ইহুদিদের উপর নেমে আসে এক খড়গ। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ইহুদিকে নেদারল্যান্ড থেকে হল্যান্ডে প্রেরণ করা হয়। যার মধ্যে বাদ যায়নি কিশোরী আনা ফ্রাঙ্কও।

এর সাত মাস পরই ১৯৪৫ সালের মার্চের শুরুতেই মারা যায় আনা। আনার মা মারগট  আগেই মৃত্যুবরণ করে অন্য একটি বন্দিশিবিরে। বেঁচে ছিলেন একমাত্র আনার বাবা অটো ফ্রাঙ্ক। অটো ফ্রাঙ্ক যখন মৃত্যুর অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসেন তখন তার দুই শুভার্থী এলি আর মিপ তার হাতে ধরিয়ে দেন একটি লাল ডোরাকাটা ডায়েরি, যা আনার লেখা।

সেই ডায়েরিটি প্রকাশিত হয়। তারপর সৃষ্টি হয় এক ইতিহাস। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রধান প্রধান ভাষায় অনুদিত হয়েছে সেই ডায়েরিটি। ৬৭টি ভাষায় অনুদিত এই ডায়েরিটি বিশ্বজুড়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩০ মিলিয়ন কপি।

আনা তার ডায়েরিটির নাম দিয়েছিল কিটি। নির্জন সেই গোপন আস্তানায় তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। তার সাথেই সে ভাগাভাগী করতো সমস্ত সুখ-দুঃখ। সেই ডায়েরি পড়লে বিস্মিত হয়ে যেতে হয় যে, এতো অল্প বয়সে একটি মেয়ের ভাবনা চিন্তা, জীবন বোধ, সমাজ দর্শন কীভাবে এতো গভীর হয়!

আনা লিখেছে, আদরের কিটি, …‘ যখন কিনা আমার প্রিয়তম বন্ধুদের মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা এই শীতের রাত্রে তারা হয়তো কোনো খানাখন্দে পড়ে রয়েছে তখন উষ্ণ বিছানায় শুয়ে আমার নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আমার সেই সব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যাদের এখন দুনিয়ার নিষ্ঠুরতম জানোয়ারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের কথা মনে হলে আমি বিভীষিকা দেখি। আর এ সবই ঘটছে তারা ইহুদী হওয়ার জন্যে! তোমার আনা, শুক্রবার, নভেম্বর, ২০, ১৯৪২।

তার সেই ডায়েরিতে আছে অনেক রাজনৈতিক ও দার্শনিক জ্ঞান। আনার ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে সে একজন সাহিত্যিক হবে। সম্প্রতি আনা ফ্রাঙ্ক আবার আলোচনায় উঠে এসেছে তার একটি মাত্র কবিতার জন্য। নিলামে যার মূল্য উঠেছে ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

বিবিসি বলছে, ১৯৪২ সালে এক বান্ধবীর কবিতার অ্যালবামের জন্য আট লাইনের ওই কবিতাটি পাঠিয়েছিল আনা। হাতে লেখা এক পাতার ওই কবিতাটির নিচে আনার সাক্ষর এবং ২৮ মার্চ ১৯৪২ তারিখ দেয়া আছে।

এর মাত্র চার মাস পরই তারা পরিবার আত্মগোপনে চলে যায়। কবিতাটি আনা তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী জ্যাকুলিনের বড় বোন ক্রিস্টিয়ান ভন মারসেনের কাছে লিখেছিল। ২০০৬ সালে ক্রিস্টিয়ান ভন মারসেন মারা যান। জ্যাকুলিন এখনো বেঁচে আছেন। তিনিই কবিতাটি বিক্রি করেছেন। 

বুব কুইপারের ওয়েব সাইটে জ্যাকুলিনের একটি লেখা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে তিনি লিখেছেন, আমার বোন (যার ডাক নাম ছিল ক্রি-ক্রি) ১৯৭০ সালের দিকে তার কবিতার অ্যালবাম থেকে অ্যানার লেখা কবিতার পাতাটি ছিঁড়ে আমাকে দিয়ে দেয়। কারণ, আমি এ লেখাটির প্রতি যতটা আকৃষ্ট ছিলাম সে ততটা ছিল না।’

অবিস্মরণীয় হওয়া আট লাইনের এই কবিতাটির শেষ চার লাইন এ রকম :

তুমি যদি কোনো ভুল করে থাকো

তার জন্য কেউ যদি তোমার নিন্দা করে

তার সবচেয়ে ভালো উত্তর হচ্ছে

নিজেকে তোমার সংশোধন করা

তার এই কবিতা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে নতুন করে ঝড় উঠে বিশ্বব্যাপী। আনা ফ্রাঙ্ক দার ডায়েরিতে বেছে নিয়েছিল এক অদৃশ্য চরিত্র, যাকে সে কিটি নামে ডাকতো। এই কিটিকে উদ্দেশ্য করেই তার লেখাগুলো তৈরি হয়েছিল। আনা ফ্রাঙ্ক তার হতাশা ও একাকীত্বকে বেশ চতুরতার সাথেই বইটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।

পাশাপাশি এই বয়সে যে মেয়েদের অন্য ছেলের প্রতি ভালোলাগা কাজ করে তা লিখতেও তিনি ছিলেন অকপট। মায়ের সাথে কিছু নিয়ে মতানৈক্য কিংবা বোনের সাথে ঝগড়া তা নিয়েও দিয়েছেন চমৎকার বর্ণনা।

উল্লেখ্য, আনা ফ্রাঙ্ক তার লেখার ক্ষেত্রে বেশ পরিপক্বতার পরিচয় দেন; বিশেষত যুদ্ধ, মানবতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে। তথ্যসূত্র: বিবিসি ও উইকিপিডিয়া

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ

মুঠো ফোন: ০১৮১৩৯৬৫৯৭৮

[img]https://www.closewe.com/media/images/blog/Capture.JPG[/img]

Topics: আনা ফ্রাঙ্ক আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি জীবন্ত ইতিহাস আনা ফ্রাঙ্ক ইতিহাসে আনা ফ্রাঙ্ক আনা ফ্রাঙ্কের লেখা

আনা ফ্রাঙ্কের যে কবিতায় কাঁপে পৃথিবী

Login to comment login

Latest Jobs