Posted By

মিয়ানমার-বাংলাদেশ সম্পর্ক

Fashion 18

 

বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। এদেশে মূলত: রোহিঙ্গা শরণার্থীর আগমন ঘটে ১৯৯১ সালে। রোহিঙ্গারা জন্মসূত্রে বার্মা তথা মিয়ানমারের নাগরিক। এদের জাতিগত পরিচয় হলো-“এরা বার্মিজ রোহিঙ্গা”। বার্মা তথা হাল-আমলের মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইন প্রদেশে এদের বসবাস। রোহিঙ্গারা অধিকাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টিতে তথায় বসবাসকারী প্রায় ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা রাষ্ট্রবিহীন। অর্থাৎ রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বহিরাগত এবং এরা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। বিশ্বের কোন দেশই জন্মগত অধিকার থেকে নাগরিকবৃন্দকে বঞ্চিত করতে পারে না, যা মিয়ানমার সরকার করে যাচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি বৃহৎ রাষ্ট্র বার্মা তথা হাল-আমলের মিয়ানমার। দেশটি উত্তরে দক্ষিণে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি যার অধিকাংশই বৌদ্ধ  ধর্মাবলম্বী। প্রায় ১৩০টি নৃ-গোষ্ঠীর লোকের বসবাস দেশটিতে। অধিকাংশ লোকজনই বার্মারাস নৃ-গোষ্ঠীর। সান,কাচিং, কাইয়ান, মন, রাখাইন, রোহিঙ্গা-এসকল লোকজনও দেশটিতে বসবাস করে আসছে প্রাচীনকাল থেকে। এংলো-বার্মিজ যুদ্ধের পর ১৯৩৭ সালের ১লা এপ্রিল দেশটি বৃটিশ কলোনীভুক্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে বার্মা এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম রণাঙ্গনে পরিনত হয়। বৃটিশদের বিতারিত করে ১৯৪২ সালে জাপানীরা বার্মা অধিকার করে নেয়। বা-মা’র নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে সরকার গঠিত হয়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়, জাপানীদের আত্বসমর্পনের মধ্য দিয়ে। দেশটি পুণরায় বৃটিশদের শাসনাধীনে চলে যায়। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী দেশটি বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

 

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে চীন, বার্মা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে। বার্মা চীনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ভারত, রাশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশ আমাদের ন্যায় সংঘত মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পক্ষ অবলম্বন করে। বিশেষ করে ভারত ও রাশিয়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করে যার ফলশ্রুতিতে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সহজতর হয়। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই বার্মার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক মধুর ছিলনা।  ১৯৮৮ সালে গণতন্ত্রের দাবিতে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসীর প্রতিষ্ঠাতা অং সান সু চি’র নেতৃত্বে ব্যাপক গণ-আন্দোলন হয়। সামরিক জান্তর চক্ষুশূলে পরিনত হন অং সান সু চি। সামরিক জান্তা তার বিরুদ্ধে বিপ্লবের নামে সহিংসতার অভিযোগ এনে তাকে গৃহবন্দী করেন। সরকার প্রহসনমূলক বিচারে অং সান সু চিকে কারাদন্ডে দন্ডিত করেন। এর পর প্রায় দুই দশক তিনি গৃহবন্দী অবস্থায় কারাগারে কাটান। স্বাধীনতার পর থেকে কোন দিনই বার্মার জনগণ গণতন্ত্রের স্বাদ আহরণের সুযোগ পায়নি। ১৯৮৮ সালে অং সান সু চির নেতৃত্বে সংগঠিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে নস্যাত করে দেয় সামরিক জান্তা। বিশ্বে যখন গণতন্ত্রের জোয়ার বইছে, অর্থাৎ গণতন্ত্রের ভরা যৌবনেও মিয়ানমারের জনগণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি সামরিক জান্তার নীপিড়ন ও নিস্পেষনে। মিয়ানমারের সামরিক সরকার জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে রোহিঙ্গাদের চরম নির্যাতন ও নীপিড়ন চালিয়ে তাদেরকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেন। উপায় উপান্তর না দেখে নির্যাতনের শিকার অসহায় গৃহহীন রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও মানবিক দিক বিবেচনা পূর্বক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় প্রদান করেন। কুটনৈতিকভাবে সফলতার সঙ্গে বিষয়টি আমরা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে পারিনি। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমার থেকে বিতারিত ও নির্যাতিত মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক বলে প্রচারণা চালায় এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। সমস্ত বিশ্বই তখন মুসলিম জঙ্গীদের জঙ্গীতৎপরতায় ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন।

 

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সফল কুটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে বিশ্ববাসীকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং আমরা মানবিক কারণে তাদেরকে আশ্রয় প্রদান করেছি। তাদেরকে  তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য সরকার আপ্রান কুটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। মনে রাখতে হবে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা, ভারতের সঙ্গে ছিটমহল সংক্রান্ত সীমান্ত সমস্যা,মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান করতে পেরেছি। অতএব, রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যারও সম্মানজনক সমাধান সম্ভব। এর জন্য উভয় দেশকেই সু-প্রতিবেশিসূলভ মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। 

Topics:

মিয়ানমার-বাংলাদেশ সম্পর্ক

Login to comment login

Latest Jobs