Posted By

বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে মাতৃভাষায় চর্চাঃ প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপরও -- ভাষা কথন: পর্ব ০১

Education 42

লেখকঃ তারেক আবরার ----

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির চরম আত্মোৎসর্গের চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশের মানুষ অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছে বাংলা ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার এক মহান ব্রতে। ভাষার এ দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন, তারই প্রেক্ষাপটে পরিচালিত হয় সশস্ত্র সংগ্রাম, অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। অবশেষে বাংলাদেশিরা সফল হয় একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। কিন্তু যেখানে ভাষার জন্য এতো মানুষের আত্মত্যাগ, সেখানেই যেন বাংলা অবহেলিত! অফিস আদালতে ইংরেজিকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এর জন্য বাংলা ভাষাভাষীদের অসচেতনতা যেমন দায়ী, তেমনি বহুলাংশে দায়ী বিদেশি অপসংস্কৃতির কুপ্রভাব। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করে, তখন এ দিবসের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে উঠে আসে সালাম, রফিক, সফিউল, বরকতের নাম। আলোচিত হয় সেসব ভাষা সৈনিকের নাম, যাাঁরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-এর আন্দোলন করেছিল, উঠে আসে বাংলা ভাষার কথা, বাংলাদেশের কথা। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার (ইউনেস্কো) প্যারিস অধিবেশনে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং একুশের চেতনাকে ধারণ করে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। তারপর ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো যথাযথ মর্যাদায় পালন করছে। তবে ২০১০ সালে ২১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৬৫তম অধিবেশনে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। উল্লেখ করা হয়, বিশ্বব্যাপী সব মানুষের ভাষাকে সুরক্ষা এবং উপস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি করাই হচ্ছে এর লক্ষ্য। এ হচ্ছে ভাষাপ্রেমিক জাতির অহংকারের বিশাল অর্জন। অথচ আমরা বাংলাদেশিরাই এ বাংলা ভাষার চরম অবমাননা করে ছাড়ছি! 

প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনামলে এ দেশে বাংলাভাষার চর্চা যেমন ব্যাহত হয়েছে, একই ধারা অব্যাহত ছিল পাকিস্তানি শাসনামলে। পাকিস্তানি শাসনামলে বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর বারবার আঘাত আসায় এর বিরুদ্ধে যেভাবে জোরালো প্রতিবাদ হয়েছে, তার জন্য আজ আমরা গর্বিত। কিন্তু দুঃখজনক হল, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন থাকেনি। বিভিন্ন দেশ মাতৃভাষা চর্চায় গুরুত্ব বাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সক্ষম হলেও আমরা তা পারিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৭ বছর পর কেন আজও বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা করা হয়না? যথাযথ বাংলা চর্চার পরিবর্তে অপসংস্কৃতির চর্চা কেন অব্যাহত রয়েছে? বাংলা ভাষাভাষীদের অসচেতনতা, সুশিক্ষার অভাব ও বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে এমনটা হয় বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

বাংলা সংস্কৃতি ও ভাষা বিকৃতির কিছু উদাহরণঃ  

বর্তমানে দেখা যায়, একটি শিশু- যে ভালোভাবে বাংলায় কথা বলাই শিখেনি, সে টেলিভিশনে ভারতীয় সিরিয়াল দেখার মাধ্যমে হিন্দি ভাষাটাই রপ্ত করে ফেলেছে। কথা বলার সময় বাংলার সাথে অযাচিতভাবে হিন্দি মিশিয়ে সেই অবুঝ শিশুই বিকৃত করে ফেলছে বাংলাকে। এ দায় কি শিশুর? অবশ্যই না। তাহলে কে এর দায় নেবে? যেখানে একটি শিশুর মাতৃভাষা বাংলা, সেখানে বাংলা ভালোভাবে বলতে পারার আগেই অন্য ভাষা কেন? বাংলার এমন বিকৃতি ঘটানোর দায় তাহলে কার?

আমাদের দেশের তথাকথিত উচ্চবিত্ত শ্রেণির কিছু মানুষ গর্ব করে বলে- আমার ছেলে/মেয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে!!  কেউ কেউ গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে বলে- আমার ছেলে/মেয়ে তো বাংলা পারেইনা, সে ইংরেজি মিডিয়ামে খুব ভালো স্কুলে পড়ে!! ভাবখানা এমন--- তাদের ছেলে/মেয়ে ইংরেজিতে এতটাই পাক্কা যে বাংলার দরকারই হয়না তাদের!!! কিন্তু, দুঃখের বিষয় এটাই যে- ইংরেজিতে পাক্কা দাবি করা এসব শিক্ষার্থী অন্য সাধারণ বাংলা মিডিয়ামে পড়া শিক্ষার্থী থেকে ইংরেজিতে কিছুটা দক্ষ হলেও সেটা  আন্তর্জাতিক মানের ধারেকাছেও পৌঁছেনা। ফলস্বরূপ, তারা না পারে বাংলা,  না পারে আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি!! মাতৃভাষা বাংলাকে জলাঞ্জলি দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি পারা সত্যিই কি সম্ভব? বিজ্ঞান বলে, মাতৃভাষার উপর ভিত্তি করেই অন্য ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে হয়। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া সত্ত্বেও যারা আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি পারে, তাদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে- স্ব উদ্যোগে মাতৃভাষায় নূন্যতম দক্ষতা অর্জন করেই তারা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেছে। তাহলে বেশিরভাগ ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া শিক্ষার্থীদের বাংলার প্রতি সাংঘাতিক এ দুর্বলতা কেন? এর জন্য দায়ী কে?    

তরুণ প্রজন্মেরর অনেকেই জানেনা বাংলার ইতিহাস, বাংলা ভাষার ইতিহাস!! একুশের বইমেলায় একজনকে প্রশ্ন করে জানা গেল- বাংলা স্বরবর্ণ ৫টি, ব্যঞ্জনবর্ণ ১০টি!! আরেকজনকে প্রশ্ন করে জানা গেল- ১৯৭১ সালে ভাষার জন্য যুদ্ধ হয়!! আরেকজনের মতে, ১৯৭২ সালে ভাষা আন্দোলন হয়!! বর্ণই চেনেনা নতুন প্রজন্ম, ওদের মুখে বাংলা শুনলে লজ্জা পাবেন আপনিও!! যেকোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেই তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বলে- এটা ১৯৭১ এ ঘটেছিল!! ভাষা আন্দেলনও ১৯৭১ এ!! তারা বিকৃতি করলো বাংলার ইতিহাস, বাংলা ভাষার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এ অবক্ষয়ের দায় কার?

বাংলা ভাষার পঠন দক্ষতা নিয়ে সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে করা এক জরিপে দেখা যায়, দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের মাত্র ৩০ শতাংশ সঠিকভাবে বাংলা রিডিং পড়তে পারে। তার মানে বাকি ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী সঠিকভাবে বাংলা রিডিং-ই পড়তে পারেনা!! যেখানে বর্ণই চেনেনা নতুন প্রজন্ম, সেখানে পঠন দক্ষতার এমন দূরাবস্থায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে এটি সত্যিই দুঃখজনক।     

মাতৃভাষা বাংলার জন্য যেখানে এত আত্মত্যাগ, এত আন্দোলন, সেখানেই বাংলার এমন অপমান!! এর জন্য দায়ী নতুন প্রজন্মের অসচেতনতা, ‘শিক্ষিত’ অভিভাবকের মূর্খতা ও অসচেতনতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আধুনিক যুগের কথিত আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে মা ও মাতৃভূমিকে ভুলে যাওয়া বা “ওভারস্মার্ট” হওয়ার চেষ্টা করা ---- এমন আরো নানা কারণেই অবহেলিত, অপমানিত হচ্ছে বাংলা ভাষা, অপমানিত হচ্ছে আমাদের হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস!!    

 

এ প্রবন্ধের দ্বিতীয় ভাগে তুলে ধরবো বিজ্ঞানের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব, আমাদের করণীয় ও সঠিক বাংলা চর্চায় কিছু বাধা অতিক্রম করার উপায়। আজ এ পর্যন্তই। গুডবাই!!    

 

আর নয় ভাসা ভাসা ভাষাজ্ঞান  

থাক তাতে ভালোবাসা-সম্মান।।  

শুদ্ধ বাংলার চর্চা ছড়িয়ে যাক সবার মাঝে।      

 

 

লেখকঃ  

তারেক আবরার  

কম্পিটিটিভ কম্পিউটার প্রোগ্রামার।

Topics: তারেক আবরার Tareq Abrar মাতৃভাষা বাংলার চর্চা International Mother Language day 21st February

বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে মাতৃভাষায় চর্চাঃ প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপরও  -- ভাষা কথন: পর্ব ০১

Login to comment login

Latest Jobs