Posted By

শিল্পী আব্দুল আলীম

Fashion 31

কিংবদন্তী লোকসংগীত শিল্পী আব্দুল আলীম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার ভালিবপুর গ্রামে ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই জন্ম গ্রহণ করেন। বাংলা লোকসংগীতের এই অমর শিল্পী লোকসংগীতকে অবিশ্বাস্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে জীবন, জগৎ এবং ভাববাদী চিন্তা একাকার হয়ে গিয়েছিল। বাল্যকাল থেকেই আলীম সঙ্গীতের প্রবল অনুরাগী ছিলেন।    

অর্থনৈতিক অনটনের কারণে কোন শিক্ষকের কাছে গান শেখার সৌভাগ্য তার হয়নি। তিনি অন্যের গাওয়া গান শুনে শুনে শিখতেন, আর বিভিন্ন পালা পার্বনে সেগুলো গাইতেন। এভাবে পালা পার্বনে গেয়ে ছোট বেলায়ই তিনি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। গানের দেশ, সুরের দেশ, বাংলাদেশ। কোন এক সময়ে এদেশের মানুষ সুরে সুরে কথা বলতো। সেই শুরু আজও তা থামেনি। আমাদের সংগীত মূলত লোকসংগীতকে কেন্দ্র করে বিকাশ লাভ করেছে। আজ যে সংগীতের এত উন্নতি ঘটেছে, আমরা নিত্য নতুন সুর নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে শিখেছি, এসবের মূল উৎস মূলত লোকসংগীত। একদিন পাখির ডাক, নদীর কালতানের মধ্যে আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম সুর। এক কণ্ঠ থেকে আরেক কণ্ঠে গান জেগেছে। এমনি করে বংশ পরম্পরায় জনমে জনমে এই গান গীত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। নদী, মাটি ও মানুষকে নিয়ে একদিন যে লোকসংগীতের জন্ম হয়েছিল এদেশে, তার সাথে সঙ্গতি রেখে উদ্ভব হয়েছিল লোকবাদ্যের। আমাদের লোকসংগীত কোন একটি ধর্মের কিংবা গোষ্ঠীর নয়- এ সংগীত গোটা বাঙালির সম্পদ, বাঙালির হৃদয় উজার করা ভালোবাসার ছন্দ। অমর শিল্পী আব্দুল আলিম লোকসংগীত গেয়ে নবজাগরনের সৃষ্টি করেন। এই মহান শিল্পী বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তার জাদুকরী কণ্ঠে বাংলার লোকসংগীত নতুন মাত্রা পায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৯৪৩ সালে তার প্রথম গানের রেকর্ড বের হয়। রেকর্ডকৃত গান দুটি হলো-‘তোর মোস্তফাকে দে-না-মা-গো’ এবং ‘আফতাব আলী বসলো পথে। জগৎ বিখ্যাত শিল্পী মোঃ রফি ও লতা মঙ্গেশকর ছাড়া আর কোন শিল্পীর গানই এত অল্প বয়সে রেকর্ডকৃত হয়নি। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতায় যান এবং সেখানে অমর লোকগীতি শিল্পী আব্বাস উদ্দিন এবং আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে গান করেন। লেটো ও যাত্রা দলেও তিনি গান করেছেন। যাত্রা দলের অনেক পালায় তিনি বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তিনি তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে ষ্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। তিনি পরে টেলিভিশন কেন্দ্র চালু হলে সেখানেও সংগীত পরিবেশন আরম্ভ করেন। তাছাড়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ সহ অনেক চলচ্চিত্রে তিনি নেপথ্যে কণ্ঠ দান করেন। তিনি ঢাকা সঙ্গীত কলেজের লোকসংগীত বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। কবি ও লোকসংগীত গবেষক আসাদ চৌধুরীর মতে, লোকসংগীতকে যারা জাগিয়েছেন তাদের মধ্যে আব্দুল আলীম অন্যতম। টেপ রেকর্ডারের যুগে আব্দুল আলীমের গানের কেসেটই সর্বাধিক বিক্রি হতো। এখনো আমাদের দেশে বিশেষ করে পল্লী অঞ্চলে আব্দুল আলীমের কণ্ঠে গীত গানগুলো মানুষের মুখে মুখে গীত হয়। এই বিখ্যাত জনপ্রিয় অমর শিল্পীর সর্বাধিক শ্রুত কয়েকটি গান হলো-‘নাইয়া রে-নাইয়ের বাদাম তুইল্লা/কোন বা দেশে যাও বাইয়া’। ‘এই যে দুনিয়া/কিসের অ লাগিয়া/কত যতেœ গড়াইয়াছে সাই।’ ‘দুয়ারে আইসাছে পালকি/নাইয়োরী নিতে/মুখে আল্লাহ রাসূলের নাম বলো সবে’। অমর শিল্পী আব্দুল আলীম বেশ কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-একুশে পদক, পৃর্বানী চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৭ সালে তাকে মরনোত্তর একুশে পদক প্রদান করে সম্মানিত করেন।

অমর এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান হয় ০৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে। লোকসংগীত শিল্পী আব্দুল আলীম বাংলার গর্ব, বাংলার অহংকার। যতদিন লোকসংগীত থাকবে ততদিন তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।

Topics:

শিল্পী আব্দুল আলীম

Login to comment login

Latest Jobs