ব্যাপন

Education 48

ক্লোজউই এর পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শ্রদ্ধার সাথে সালাম আর আন্তরিক শুভেচ্ছা।  আজকে আলোচনার বিষয় হলো : ব্যাপন। ব্যাপন বিষয়ে সম্যকভাবে জানতে সম্পূর্ণ পড়ার অনুরোধ থাকল।

 

ব্যাপনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা :

 

  ব্যাপন বলতে চারিদিকে ছড়িয়ে যাওয়াকে বোঝায়। আমরা জানি,সকল পদার্থই কতগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণু দিয়ে তৈরি। এ অণুগুলো সবসময় পদার্থে চলন্ত অবস্থায় থাকে।তরল ও গ্যাসের ক্ষেত্রে অণুগুলোর চলন দ্রুত হয় এবং বেশি ঘনত্বের স্থান  থেকে কম ঘনত্বের দিকে অণুগুলো ছড়িয়ে পড়তে থাকে।এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে যতক্ষণ না অণুগুলোর ঘনত্ব  দুই স্থানে সমান হয়।অণুগুলোর এরূপ চলন প্রক্রিয়াকে ব্যাপন বলে।

 

 

ব্যাপনের বৈশিষ্ট্য :

১.  ব্যাপনকারী পদার্থের অণুগুলো প্রচুর গতিশক্তি ও প্রচুর ঘনত্বের অধিকারী  হয়ে থাকে।

২.  তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের অণুগুলোর ব্যাপন ক্ষমতা,কঠিন পদার্থের অণুগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ।এর কারণ হলো কঠিন পদার্থের অণুগুলোর মাঝের যে আন্তঃকণা আকর্ষণ বল(আন্তঃকণা বল  বলতে অণুগুলোর মধ্যের একে অন্যের সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতাকে বোঝায়)  তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের অণুগুলোর মাঝের আন্তঃকণা আকর্ষণ বল থেকে অনেক বেশি থাকে। কঠিন পদার্থের অণুগুলোর আন্তঃকণা আকর্ষণ বল অনেক বেশি বলে সেই অণুগুলো সহজেই ছড়িয়ে যেতে পারে  না অর্থাৎ তাই ব্যাপন কম। আর তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের অণুগুলোর মাঝের আন্তঃকণা আকর্ষণ বল অনেক কম   তাই তারা দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে  অর্থাৎ ব্যাপন বেশি হয়।

৩.   যেসব গ্যাসের আণবিক ভর যত বেশি তাদের ব্যাপন হার (ব্যাপন ক্ষমতা ) তত কম। যেমন : অক্সিজেন ও হিলিয়ামের আণবিক ভর ৩২, ০৪।তাই কথা অনুযায়ী, হিলিয়ামের ব্যাপন হার অক্সিজেন অপেক্ষা অনেক বেশি।

৪.   কঠিন, তরল,গ্যাসীয় অর্থাৎ যে কোনো পদার্থকেই যত বেশি তাপ দেওয়া হবে পদার্থের অণুগুলোর ব্যাপন ক্ষমতা তত বাড়বে। এর কারণ  হলো,যে কোনো পদার্থে তাপ দিলে প্রথমে তাপ পেয়ে পদার্থের অণুগুলোর আন্তঃকণা বল কমে যায় অর্থাৎ তাদের বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। ফলে তারা আগের থেকে বেশি  তাড়াতাড়ি চারিদিকে ছড়িয়ে যেতে পারে।

৫.   তরল মাধ্যম থেকে  তরল মাধ্যমে ব্যাপন হলে যে পরিমাণ তাড়াতাড়ি অণুগুলোর ব্যাপন হয়, আবার কঠিন মাধ্যম থেকে তরল মাধ্যমে যে পরিমাণ ব্যাপন হয় সেটা তার  থেকে বেশি। অর্থাৎ সমপদার্থের মধ্যে ব্যাপন বেশি হয়।

                                 [ এটি সকল পদার্থের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ]

৬.  পদার্থের অণুগুলো বেশি ঘনত্বের স্থান থেকে কম ঘনত্বের দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে যতক্ষণ না অণুগুলোর ঘনত্ব  দুই স্থানে সমান হয়।

         {৩,৪ নং বিষয়গুলো আরো সহজে বোঝার জন্য সর্বনিচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো}

 

 

 

 

 

ব্যাপনের উদাহরণ :

ঘরে সেন্ট বা আতর বা ধূপ জ্বলালে সমস্ত ঘরে তার সুবাস ছড়িয়ে যায়।এটি ব্যাপনের কারণে ঘটে। ধূপের ধোঁয়া ও সেন্টের অণুগুলোর অধিক ঘনত্ব  সম্পন্ন হওয়ায় সম্পন্ন ঘরে বেশি ঘনত্ব থেকে কম ঘনত্ব স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।তাই সমস্ত ঘর সুবাসে ভরে যায়।

 

ব্যাপনের বৈশিষ্ট্যের বিভিন্ন পরীক্ষা :

 

১.একটা  সরু কাঁচনল নিতে হবে যাতে তার উভয় দিকেই ফাঁকা থাকে।এর পর হাইড্রোক্লোরাইড এসিডের দ্রবণে একটু তুলা ভিজায় আর   অ্যামোনিয়াম  হাইড্রোক্সাইডের  এসিডের দ্রবণে একটু তুলা ভিজায়।তারপর এই দুই টুকরা তুলা এবার কাঁচনলের দুই দিকে লাগায়।এখানে হাইড্রোক্লোরিক এসিড দ্রবণ থেকে হাইড্রোজেন ক্লোরাইড গ্যাস এবং অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড দ্রবণ থেকে অ্যামোনিয়া গ্যাস ব্যাপিত হবে।কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে যে, কাচনলের ভিতরে হাইড্রোজেন ক্লোরাইড গ্যাস ও অ্যামোনিয়া পরস্পরের সাথে বিক্রিয়া করে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড সাদা ধোঁয়া সৃষ্টি করেছে।সাদা ধোঁয়ার অবস্থান কাঁচনলের ঠিক মাঝামাঝি হবে না। এটি হাইড্রোক্লোরিক এসিড দ্রবণের কাছে  এবং অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড দ্রবণ  থেকে দূরে অবস্থান করবে। অর্থাৎ একই সময়ে হাইড্রোজেন ক্লোরাইড গ্যাস কম দূরত্ব  এবং অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড বেশি দূরত্ব অতিক্রম করবে।এ পরীক্ষা থেকে বোঝা যায় যে, অ্যামোনিয়া গ্যাস হাইড্রোজেন ক্লোরাইড গ্যাস থেকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।এর মূল কারণ হলো মূলত আণবিক ভর।উপরে উল্লেখিত  ব্যাপনের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আমরা জানি, "যে গ্যাসের আণবিক ভর যত কম তার ব্যাপন হার ( ছড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা) তত বেশি ।হাইড্রোজেন ক্লোরাইড গ্যাস আর অ্যামোনিয়া গ্যাসের আণবিক ভর যথাক্রমে ৩৬.৫,১৭।আর তাই অ্যামোনিয়া গ্যাসের ব্যাপন ক্ষমতা বেশি।

 

২.    প্রথমে দুইটি টেস্টটিউবকে নিই।এরপর প্রথম টেস্টটিউবে ৫ মি.মি ঠান্ডা পানি নিই।আর দ্বিতীয় টেস্টটিউবে ৫ মি.মি গরম পানি নিই।তারপর দুই টেস্টটিউবেই একই পরিমাণ পটাশিয়াম প্যারম্যাঙ্গানেট ছেড়ে দিই। দেখা যাবে যে দ্বিতীয়  টেস্টটিউবে পটাশিয়াম প্যারম্যাঙ্গানেট যত তাড়াতাড়ি ছড়াচ্ছে প্রথম টেস্টটিউবে তার চেয়ে দেরিতে আর কম ছড়াবে।

এর কারণ হলো পদার্থের যত তাপমাত্রা বাড়বে তত তাদের ব্যাপন ক্ষমতা তত বাড়বে। আর তাই দ্বিতীয় টেস্টটিউবের তাপমাত্রা বেশি থাকায় এর ব্যাপন ক্ষমতা বেশি।

 

ব্যাপনের ব্যাস্তবিক প্রয়োগ :

 

১.  উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের সময় বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে আর অক্সিজেন ত্যাগ করে। আর প্রাণীরা সেই অক্সিজেন গ্রহণ করে আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে।এই কাজগুলো ব্যাপন দ্বারা হয়। উদ্ভিদ ঘন অক্সিজেন ত্যাগ করে।এই ঘন অক্সিজেনের অণুগুলো বেশি ঘনত্বের হওয়ায় কম ঘনত্বের দিকে ছড়িয়ে পড়ে বাতাসের মাধ্যমে।এইভাবে  ব্যাপন দ্বারা ছড়ানো অক্সিজেন  প্রাণীরা গ্রহণ করে।

২.  উদ্ভিদ দেহে শোষিত পানি বাস্পাকারে প্রস্বেদনের মাধ্যমে দেহ থেকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় বের হয়ে যায়। 

৩.  ব্যাপন প্রক্রিয়ার দ্বারা কোষে অক্সিজেন প্রবেশ করে।আর কার্বন - ডাই- অক্সাইড বের হয়।

৪.  শ্বসন প্রক্রিয়া ব্যাপন প্রক্রিয়া ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

 

 

Topics:

ব্যাপন

Login to comment login

Latest Jobs