শাহ আমানত থেকে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে

Fashion 6

শাহ আমানত থেকে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে

 

'আমেরিকা যেতে কতক্ষণ লাগে?', দূর পাল্লার আকাশ ভ্রমনে যাঁদের অভিজ্ঞতা নেই তাঁরা প্রায়ই এ প্রশ্নটি করেন। দেশে অবস্থানকালীন বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় ও পরিচিতজনের সাথে আলাপের সময় প্রায়ই এই প্রসঙ্গটি উঠে আসে। পৃথিবীর গোলাকার মানচিত্রে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একেবারেই দুই বিপরীত দিকে। অর্থাৎ ভূ-গোলকের যে পৃষ্ঠে বাংলাদেশ অবস্থিত, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তার সম্পূর্ণ বিপরীত পৃষ্ঠে। এবার বাংলাদেশ থেকে নিউ ইয়র্ক আসার সময় বিমান যাত্রা শুরু করেছিলাম চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দর থেকে। জানুয়ারি ১৭, ২০১৯। বিমান বন্দরে বিদায় জানাতে আসা বন্ধু ও পরিবার সদস্যদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। নিরাপত্তা তল্লাশি শেষে বোর্ডিং পাস নিয়ে বিমানে উঠার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক পড়লো। ওয়েটিং এরিয়া থেকে এয়ার লাইনের একটি সার্ভিস বাস আমাদেরকে উড্ডয়নের জন্য অপেক্ষমান ফ্লাইটের কাছে নিয়ে গেলো। সব যাত্রী অভ্যন্তরীন ফ্লাইটের এয়ারক্রাফ্টটিতে উঠে বসলাম। ফুল ফ্লাইট। কোন সিটই খালি নেই। এয়ারলাইনগুলোর ডমেষ্টিক ফ্লাইটের ব্যবসা এখন জমজমাট। অভ্যন্তরীণ রুটে বাংলাদেশ বিমান ছাড়াও বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিমান কোম্পানি এখন সার্ভিস দিচ্ছে। সড়কপথে জ্যাম, দুর্ঘটনা, যাত্রা বিলম্ব ইত্যাদি কারণে এখন অনেকেই সড়ক পথের বদলে আকাশ পথ বেছে নিচ্ছেন। সামর্থ্যবান যাত্রীদের জন্য বিমানই উপযুক্ত। সময় বাঁচানোর জন্য আকাশ পথের বিকল্প নেই। আসন্ন সন্ধ্যার চমৎকার আবহাওয়ায় নভো এয়ারের ছোট উড়োজাহাজটি আট ষষ্ঠী জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে আকাশে উড়াল দিলো। মাত্র পঞ্চাশ মিনিটে ভূমি থেকে পনের হাজার ফুট উঁচুতে উড়ে উড়ে পৌঁছে গেলো ঢাকার শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। নভো এয়ারের সার্ভিস ভালো। দু'সপ্তাহ আগে নভো এয়ারেই ঢাকা থেকে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। সে বার ভালো লাগার কারণেই আবারও নভো'রই টিকেট কাটলাম। বিশেষ করে এ এয়ার লাইনের ইনফ্লাইট সার্ভিস খুব পছন্দ হলো। ছোট হলেও জাহাজটির ভেতরটা সুন্দর, পরিপাটি। লাবণ্যময়ী তরুণী কেবিন ক্রু রোজলিন ও স্মার্ট তরুণ জয়ের আন্তরিক আতিথেয়তা ছিলো চমৎকার। বিশুদ্ধ উচ্চারণে ইনফ্লাইট এনাউন্সমেন্টে রোজলিনের কন্ঠ ছিলো নিখুঁত সুন্দর। ক্যাপ্টেন জাহিদের বিমান চালনায় ছিলো দক্ষতার চাপ। বিশেষ করে স্মার্ট টেক অফ এবং স্মুথ ল্যান্ডিং ছিলো প্রশংসনীয়। দীর্ঘ বিমান যাত্রার বিরক্তিকর বিড়ম্বনা শুরু হলো ঢাকায়। যাত্রার দৈর্ঘ্যের পাশাপাশি আকাশ ভ্রমনের আরেকটি বিরক্তিকর বিষয় হলো কানেক্টিং ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করা। ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্কের সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই। মধ্যখানে একটা বা দু'টো বিমান বন্দরে যাত্রা বিরতি ও বিমান পরিবর্তনের মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক পৌঁছতে হয়। আমার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ছিলো কুয়েত এয়ারওয়েজে। ঢাকা থেকে ফ্লাইটটি ছিলো রাত দু'টোয়। সুতরাং শুরু হলো 'অপেক্ষা'র যন্ত্রণা! সাথে যোগ হলো রয়েল সাইজের মশার বিরতিহীন নির্মম জ্বালাতন। ঢাকা এয়ারপোর্টে এত্তো মশা! হাত-পা নেড়ে কিংবা বাতাসে চড়-থাপ্পড় মেরে যতই চেষ্টা করি না কেন মশাদের নাছোরবান্দা আক্রমণ থেকে কোনভাবেই রেহাই পাওয়া যাচ্ছিলো না। রিজিকের অন্বেষণে মানব রক্তের সন্ধানে এ প্রাণিদের তৎপরতায় বিমান বন্দরে অপেক্ষমান যাত্রীরা ছিলো একেবারেই অসহায় আর ত্যক্ত-বিরক্ত। সে এক মহা বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা। যাত্রী সেবায় শাহজালাল বিমান বন্দরের অনেক আয়োজন প্রশংসনীয় হলেও মশা নিবারণের বিষয়টা দেখার জন্য বোধহয় কেউ নেই! ঢাকা থেকে কুয়েত এয়ারওয়েজের বিশাল বিমানটি উড্ডয়ন করলো রাত দু'টোয়। কুয়েত সিটিতে পৌঁছলাম প্রায় পাঁচ ঘন্টায়। এর পর আরেক অপেক্ষার পালা। কুয়েত থেকে নিউ ইয়র্কের ফ্লাইটটি ছাড়বে আরো আড়াই ঘন্টা পর। ফ্লাইটটি ছিলো তের ঘন্টার ডাইরেক্ট ফ্লাইট। যথাসময়ে আমরা বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর মডেলের বিশাল উড়োজাহাজটিতে উঠে বসলাম। সম্প্রতি কুয়েত এয়ারওয়েজ তাদের বিমান বহরে অনেক নতুন বিমান যোগ করেছে। ইনফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট সহ যাত্রী সেবার মানও বাড়িয়েছে। তাছাড়া টিকেটে বিশাল ডিসকাউন্ট থাকায় পুরো ফ্লাইট ছিলো যাত্রীময়। দূর পাল্লার আকাশ ভ্রমনে আমি সব সময়ই 'Aisle seat'এ বসি। বড় সাইজের বিমানগুলোতে এক সারিতে দশজন যাত্রী বসার ব্যবস্থা থাকে। দু'দিকে জানালার পাশে তিনজন করে ছ'জন এবং মধ্যখানে চারজন। তিন সিট ও চার সিটের মধ্যে চলাচলের জন্য যে ছোট্ট জায়গা থাকে সেটাকে বলা হয় Aisle। চলাচলের পথ বা Aisle এর পাশের আসনকে বলা হয় Aisle seat। এ সিটে বসার সুবিধা হলো দীর্ঘ বিমান যাত্রায় বসতে বসতে বিরক্ত হয়ে পড়লে কিংবা টয়লেট ব্যবহারের প্রয়োজন হলে সহজেই সিট থেকে উঠা যায়। কিন্তু জানালার পাশে কিংবা ভিতরের সিটে বসলে উঠার জন্য পাশের যাত্রীকে বিরক্ত করতে হয়। পাশের যাত্রী কিংবা সামনের সিটের যাত্রী সিট পেছনে হেলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেতো বিরাট ঝামেলা। আমার পক্ষে পাঁচ বা তের ঘন্টার ফ্লাইটে কোনভাবেই একটানা বসে থাকা সম্ভব হয় না। ঘন্টা দু'-এক বসার পর 'আইল' দিয়ে চারিদিকে এক চক্কর দিয়ে আসতে হয়। কিংবা বিমানের পেছন দিকের ফাঁকা জায়গায় গিয়ে কিছুক্ষুন দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্তি নিরসনের চেষ্টা করি। ট্রেন, বাস কিংবা বিমানে আমি কখনওই ভালোভাবে ঘুমাতে পারি না। তাই বার বার সিট থেকে উঠতে হয়। টয়লেটে যেতে হয়। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেস হতে হয়। বার বার সিট থেকে উঠতে হলে Aisle Seat ই সবচেয়ে সুবিধাজনক। কেউ কেউ অবশ্য 'Window seat' পছন্দ করে। অনেককে আবার বিমানে আরোহনের কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়তেও দেখা যায়। চমৎকার আবহাওয়ায় আমাদের ফ্লাইটটি নিউ ইয়র্কের পথে উড়ছিলো ভূমি থেকে পয়ত্রিশ হাজার ফুট উঁচুতে। ফ্লাইটের বাইরে আকাশের সেই উচ্চতায় তখন তাপমাত্রা ছিলো মাইনাস ৫৬° সেলসিয়াস !! পয়ত্রিশ থেকে বেয়াল্লিশ হাজার ফুট উচ্চতার বায়ু স্তরটি বড় সাইজের বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের জন্য সবচেয়ে উপযোগি। অবশ্য দ্রুততম গতির সুপারসনিক জেট বিমান কনকর্ড চলাচল করে ছাপ্পান্ন থেকে ষাট হাজার ফুট উচ্চতায়। ভূমি থেকে পয়ত্রিশ হাজার ফুট উচ্চতার বায়ু স্তরে সাধারণতঃ মেঘের ঘনঘটা থাকে না। আকাশের এ জায়গাটা ঘন মেঘের স্তরের অনেক উপরে। এখানে বায়ু ঘনত্বও অনেক কম। ফলে হালকা বায়ু ঠেলে সামনে এগুতে বিমানের জ্বালানি খরচও কম হয়। এতোটা উচ্চতার প্রচন্ড ঠান্ডায় পাখি উড়ে না। হেলিকপ্টার কিংবা ছোট বিমানও এতো উঁচুতে ওড়ে না। ফলে বিশাল বিমানগুলোর ককফিটের সামনে থাকে শুধুই সীমাহীন নির্মল নীল আকাশ! আবহাওয়া ভালো থাকায় কুয়েত-নিউ ইয়র্ক ফ্লাই টাইম এক ঘন্টা কমে এলো। বিমান উড়লো টানা বার ঘন্টা। অবশেষে আমাদের ফ্লাইটটি নিউ ইয়র্কের জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করলো। ঝাঁকুনিহীন স্মুথ ল্যান্ডিং এর জন্য পাইলট আহমেদ আর আন্তরিকতাময় আতিথেয়তার জন্য কেবিন ক্রুদের ধন্যবাদ। নিউ ইয়র্কে তখন সন্ধ্যা পাঁচটা। এক সন্ধ্যায় আরোহন। আরেক সন্ধ্যায় অবতরণ! শেষ হলো সুদীর্ঘ বিমান যাত্রা - শাহ আমানত থেকে জেএফকে।

 

(লেখক নিউ ইয়র্ক  প্রবাসি)

Topics:

শাহ আমানত থেকে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে

Login to comment login

Latest Jobs