পাহাড়কে পাহাড়ের মতো থাকতে দিন

Fashion 19

পাহাড়কে পাহাড়ের মতো থাকতে দিন। পাহাড়ই তার নিজস্ব তরিকায় সারিয়ে নিবে নিজের ক্ষত। কারণ পাহাড়ি প্রকৃতিই ভাল করে জানে কোন স্থানে বাঁশবন, কোন স্থানে লতাগুল্মের ঘন অরণ্য কিংবা পাহাড়ি নিজস্ব জাতের বৃক্ষরাজীর জন্ম দিলে তার শরীর অক্ষত থাকবে, রক্ষা পাবে ভারী বৃষ্টির হাত থেকে। গবেষণার নামে, পর্যটনের নামে, বনায়নের নামে, ইজারা নেয়ার নামে আর পাহাড় নির্যাতন নয়। আগে যারা পাহাড়ে বসবাস করতেন তাদের বলা হতো জুম্মু। জুম্মুরা পাহাড়বান্ধব জুমচাষের মাধ্যম জীবিকা নির্বাহ করতেন। তারা কখনো পাহাড়ের মালিকানা দাবী করতেন না। জুম্মুরা ভাবতেন পাহাড় তাদের অন্নদাতা, আশ্রয়দাতা, পাহাড়ই তাদের মালিক, তাদের ‘মা’। এসব প্রকৃতির সন্তানেরা পাহাড়ের পাদদেশে এমন প্রজাতির গাছ-বাঁশের খুঁটি দিয়ে মাচাংঘর বনাতেন, সে খুঁটিগুলোর গোড়ায় শিকড় গজিয়ে পাহাড়ের মাটি ধরে রাখতো। পরবর্তীতে অতি উৎপাদন, পর্যটন ও নানা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চোখ পড়ে পাহাড়ের শরীরে। নির্বিচারে শুরু হয় পাহাড় ইজারা দেয়া। পৃথিবীর পেরেকরূপী (কোরআনের বর্ণনামতে) মালিকহীন স্বাধীন পাহাড়ের উপর যখন মালিকানা চাপিয়ে দেয়া হয়, মুলত তখন থেকেই শুরু হয় পাহাড় নির্যাতন। সমতলের পাহাড়ি বসতিতে অনভ্যস্ত মানুষগুলো প্রথমে শুরু করে পাহাড় কেটে ব্যাপক বসতি। তারপর অতি উৎপাদনের নেশায় শুরু করে পাহাড়ি তরিকার বাইরের পদ্ধতিতে চাষাবাদ। যেখানে পাহাড় তার শরীর রক্ষায় বাঁশবন জন্ম দিতো সেখানে সমতলের মানুষগুলো শুরু করলো পেঁপেঁচাষ। যেখানে পাহাড় তার আপন শরীর রক্ষায় লতাগুল্মবেষ্টিত পাহাড়ি কলাগাছ জন্ম দিতো সেখানে সমতলের মানুষগুলো শুরু করলো ভিনদেশী ইউক্লিপটাস জাতীয় ঘাসবিধ্বংসী গাছগাছালি। পাহাড়ের ঢালু কিংবা পাদদেশে বড়ো বড়ো প্রাচীন আমলকি, হরতকি গাছ দিয়ে পাহাড় যেখানে রক্ষাকবচ রচনা করতো সেখানে সমতলের মানুষগুলো শুরু করলো কলাবাগান, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক পাহাড়ি তরিকায় খাপছাড়া নানাপদের বাগান। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বনায়নের যাতনা চালানো হয়েছে নানাস্থানে। এভাবে বছরের পর বছর ধরে নির্দয়ভাবে ধ্বংস করা হয় পাহাড়ের নিভৃতচারী জীবন-যাপন। এছাড়াও সমতলে রাস্তাঘাট তৈরীতে, ইটভাটায় নানা প্রয়োজনে প্রতিযেগিতা দিয়ে কাটা হয় পাহাড়, পুরানো সব বড় বড় গাছ, বাঁশ কেটে ন্যাড়া করে দেয়া হয় পাহাড়ের আব্রু। সরকারী-বেসরকারী নানাধরণের উন্নয়ন পরিষদ তাদের কার্যালয়, হোটেল মোটেল স্থাপন এবং পাহাড়ের গতিবিধি গবেষণা না করে এলোপাতাড়ি রাস্তা-ঘাট নির্মাণ পাহাড়ের বুকে পিঠে, উদরে সৃষ্টি করে বিশাল বিশাল ক্ষত। যেমনটি পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধস সেখানকার দীর্ঘদিন ধরে চলা এধরণের অযৌক্তিক উন্নয়ণের বিরুদ্ধে পাহাড়ি প্রকৃতির বিভৎস প্রতিবাদ। নির্বিচারে গাছনিধন আর পহাড়ে সমতলের মতো করে বসতি স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়ণই পাহাড়ধসের মূল কারণ। পাহাড়ে গাছ জন্মাবে পাহাড়ের নিয়মে, জংলা রচনার পেট চিরে লতাগুল্ম জড়িয়ে। দেখা যায় সমতলের ক্ষমতাশালী লোকজন আদিম সেই পাহাড় কিনে বনায়ন কিংবা বাগান করার নামে অসংখ্য ক্ষত করেছে পাহাড়ের শরীরে। পাহাড়ে বসবাসেরও নিজস্ব তরিকা আছে। সমতলের মানুষ পাহাড়িদের পাহাড়চুঁড়ায় বসবাসকারী মাচাং পদ্ধতি বাদ দিয়ে কোদাল-হাতুড়ি দিয়ে বসতি নির্মাণ করেছে পাহাড়ে। সরকারি যন্ত্র পাহাড়ের কথা না ভেবে নিজেদের সুবিধায় তৈরী করেছে রাস্তা-ঘাট, ভবন, প্রাসাদ। অবশেষে দীর্ঘ ক্ষোভ জ্বলন্ত লাভা হয়ে ঢেলেছে পাহাড়! আজ থেকে কয়েক যুগ আগে সম্ভবত এজন্যই পাহাড়ি-প্রকৃতির সন্তান আদিবাসীরা তাদের আদি জুম্মু জীবন রক্ষার মধ্য দিয়ে পাহাড়ের প্রতি এমন ব্যভিচার ঠেকাতেই ‘জুমল্যান্ড’ এর স্বপ্ন দেখেছিলেন । আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; পর্যটনের জন্য পাহাড় নয়, পাহাড়ের জন্য পর্যটন - এধরণের ধারণা নিয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার্থে নিঃসন্দেহে পর্যটনশিল্প রক্ষার চেয়ে পাহাড় রক্ষা হাজারগুণ বেশী গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনের নামে নিভৃতচারী পাহাড়,পাহাড়ি জনপদ এবং পাহাড়ি প্রাণীবৈচিত্রে বিঘœ ঘটানো অবশ্যই অন্যায় এবং সভ্যতা বিরোধী কর্মকান্ড। পার্বত্য চট্টগ্রামে এবারের বিপর্যয় লক্ষ্য করলে দেখা যায় যেখানে বেশী উন্নয়নের নামে সভ্যতার নামে, নগরায়নের নামে, পর্যটনের নামে, আধুনিকায়নের নামে বেপরোয়া কর্মকান্ড চালানো হয়েছে সেখানেই বেশী ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়েছে। এই জায়গাটিতে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে। কারণ পাহাড় রক্ষা ছাড়া আমাদের আর কোন পথ নেই। পাহাড় শুধু পরিবেশ রক্ষা ও বনজ সম্পদের যোগান দিচ্ছে না পাহাড়ের সুস্থতার উপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে নদ-নদী, খাল-বিলের জলধারা। আর এই পাহাড়ি জলধারার উপর নির্ভর করে আমাদের মিঠাপানির মৎস্যসম্পদ, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় বা নদ-নদীর দু’পাড়ের প্রাণীবৈচিত্র, দু’পাড়ের জনপদের জীবন-জীবিকা। শুধূ পার্বত্য চট্টগ্রাম নয় সাগরপাড়ের চট্টগ্রামের আপার সৌন্দর্য পাহাড়গুলো আজ ধ্বংসের মুখোমুখি, বিলীন প্রায়। চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়গুলো আগামী বিশ/ত্রিশ বছরের মধ্যে অস্তিত্ব হারিয়ে ইতিহাস হয়ে যাবে- এব্যাপারে চট্টগ্রামবাসী মোটামোটি নিশ্চিত। নানাসময়ে ক্ষমতাধরেরা সরকারি ছত্রছায়ায় পাহাড় দখল করে পাহাড়ের পাদদেশে বিভিন্নস্থানে বস্তি স্থাপন এবং সিএনজি পাম্প, পেট্রোল পাম্প স্থাপন করে পাহাড় নিশ্চিহ্ন করার বিষয়টি মোটামোটি নিশ্চিত করে দিয়েছে। চট্টগ্রামবাসীর জন্য আরো ভয়াবহ দুঃসংবাদ আছে। চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার সীতাকুন্ড থানার জঙ্গল সলিমপুর ও জঙ্গল লতিফপুর এলাকায় ২০/২৫ কিমি. জুড়ে নয়নাভিরাম দীর্ঘ সবুজ পাহাড়ি ঘেরাও আজ ভীষণ হুমকির মুখে। পাহাড়গুলো বিলীন হতে হতে প্রায় বিলুপ্তির পথে। বিভিন্ন সময়ে সরকারি লোকজনের মদদে ওখানে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় অবৈধ পাহাড়কাটা আর অবৈধ বসতি। এবারের বর্ষায় বাংলাদেশের মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামে যেভাবে পাহাড়ধস এবং পাহাড়ি বিপর্যয় লক্ষ্য করেছে তা হয়তো আগামী বর্ষায় চট্টগ্রামের আকবরশাহ, বায়েজিদ, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়িসহ সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুর ও জঙ্গল লতিপফুরেও সংঘটিত হতে পারে। চট্টগ্রাম শহরের কাছাকাছি হওয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ জবরদখল চলছে জঙ্গল সলিমপুর ও জঙ্গল লতিপফুরসহ নগরীর আকবর ও বায়েজিদ থানার পাহাড়গুলোতে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসন যৌথভাবে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আগামী বর্ষায় চট্টগ্রামে আরেকটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। পাহাড়ধস বিষয়ে যাদের পূর্বঅভিজ্ঞতা রয়েছে তারা খুব ভাল করেই জানে এটি এক মারাত্মক ভয়াবহ দুর্যোগ। এধরণের দুর্যোগে উদ্ধার তৎপরতা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বলা যায় পাহাড়ধস একধরণের প্রকৃতির প্রতিশোধও বটে। পাহাড়ের প্রতি মানুষের অত্যাচারের প্রতিশোধ। রাঙামাটি, বান্দরবন ও চট্টগ্রামে ভয়াবহ পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছে অনেক অমূল্য জীবন। আসুন পাহাড়ের পাদদেশ থেতে দ্রুত সরিয়ে নিই মানুষের বসতি। পাহাড়কাটা বর্জন করি। পাশাপাশি খুব সচেতনভাবে আইনে পাহাড়কাটা, টিলাকাটার জন্য অত্যন্ত কঠোর ও অমার্জনীয় শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। পাহাড়কাটা রোধে শক্ত আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং এবিষয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে জিরো-টলারেন্স নীতি অবলম্বনও জরুরী। আর বক্তব্য নয়, পাল্টাপাল্টি নয় রেষারেষি নয়, পৃথিবীর প্রয়োজনে, আগামী প্রজন্মের প্রয়োজনে পাহাড়কে ভালবাসতে হবে। পাহাড় রক্ষা করতে হবে আপন ‘মা’, আপন সন্তানের মতো করে। 

 

--সৈয়দ মামুনূর রশীদ।

Topics:

পাহাড়কে পাহাড়ের মতো থাকতে দিন

Login to comment login

Latest Jobs