পাসপোর্ট অফিসের বড়কর্তা

Fashion 43

পাসপোর্ট অফিসের বড়কর্তা এনজিওতে চাকুরী করি শুনে বললেন, বসেন! আলাপ আছে এট্টু। টানা তিনদিনব্যাপি গুড়বাজারের কুত্তার মতো ঘুরেছি। দয়াময় কেউ বসতে বলাতো দুরে থাক, চেহারার দিকে ফিরেও তাকায়নি।

অবাক হয়ে আশ-পাশ তাকালাম, অন্য কেউ নয়তো!

কারণ কুত্তা ভাগাতে পাবলিক যেমন গরমপানি ঢেলে ছাল তুলে দেয়, পাসপোর্ট অফিসের জিরো থেকে সব কর্মকর্তারা পদে পদে এমন কস্টটাই দিয়েছে আমাকে, এ ক'দিনে।

বড়কর্তা জানতে চায় বাংলাদেশে এনজিওগুলান কী কাজ করতাছে?

আমি জানাই, মাইনষের ফ্রেইমে মানুষ ঢুকানোর চেষ্টা করতাছে!

কর্তা হাসলেন, হাত ইশারায় বুঝালেন; উত্তর তার লাইক হয়েছে।

গতকাল আবেদন ফর্মের আগাগোড়া তল্লাশি কইরা যখন সিগনাল দেখে নাই, ফিরিয়ে দিছে! তাচ্ছিল্যে নুন্যতম কিছু ইসু্্য উল্লেখ কইরা বলেন, ফের লইয়া আসুন, সুময় নাই এতো বুঝানোর !

এখন আমার পাসপোর্ট আবেদন ফর্মে দালালের সিগনাল দেখেছেন তাই মিঠাকথার ফুলঝুরি বের হচ্ছে বোধহয়।

আমি তৎক্ষনাৎ ভাবলাম; বাংলাদেশের আনাকানায় ঘুরে ঘুরে বাংলাভাষার একটি গালি'র বই লিখবো আর এ বইয়ের এক্কেবারে কাভার পেইজে বড়কর্তার নাম ঠিকানা ছাপাইয়া লিখবো এ বইয়ের সমস্ত গালিসমগ্র তাঁর উদ্দেশ্যে।

ঘটনা শুনুন মেহেরবান জনগণ! খায়েশ ধরেছে পাসপোর্ট বানামু! পাসপোর্ট অফিসের ওয়েবসাইট তন্নতন্ন করে ঘেঁটেছি এক সপ্তাহ। দেখলাম অনলাইনে আবেদনের সুযোগ আছে মাগার প্রার্থীর ছবি ঢুকানোর জায়গা রাখে নাই। তবুও ভাবলাম অনলাইনে আবেদন করলে ভুল হওয়ার চান্স নাই!

ভুল হওয়ার চান্স না থাকলে ধান্দা করার চান্সও থাকবে না।

যা চিন্তা করেছি বাস্তবেও তাই!

ভুল তথ্য দেয়ার কোন সুযোগ নাই!

স্বয়ংক্রিয় খেলায় এনআইডি নাম্বার ভেরিফাই হইলো, তারপর কইলো নাম্বারটা ঠিক কইরা লন!

দ্বিতীয়বার হুঁশ করে নাম্বার দিলে গভীর রজনীর মতো নাম্বারটা নিল! আশ্বস্ত হলাম আমি।

প্রিন্ট নিয়া নির্দেশনা মোতাবেক সব কাগজপত্র সংযুক্ত করলাম।

সবশেেষে মনোযোগ দিলাম সত্যায়নে। যদিও কাগজপত্র সত্যায়ন করা এতো সহজবিদ্যা নয়।

আল্লাখোদার নাম লইয়া একদিন দাঁড়াইলাম পাসপোর্ট অফিসে আবেদন ফর্ম জমা দেওনের লাইনে। শ'খানেক আদমির পশ্চাৎ অতিক্রম শেষে পেঁৗছালাম যেখানে, সেখানে দেখলাম বসে আছে দুইজন।

প্রথমজন ফরম দেখে কইলো, হুঁমমমম! অনলাইন! এ বলে ছুঁড়ে দিল দ্বিতীয়জনের কাছে। তাদের চোখ দেখাদেখি আর মন্তব্যে আমার মনে হলো অনলাইনে আবেদন করে বোধহয় কোন ঝামেলা করে ফেললাম!

অপরাধবোধ কাজ করছে মনে।

দ্বিতীয়জন ফরম উল্টাইয়া কইলো, কই? কিছুইতো দেখতেছি না বস!

তারপর আমার দিকে কিঞ্চিত তাকাইয়া কইলো, রসিদ কই?

আমি বললাম নীচে আছে, সংযুক্ত।

কইলো, এটা উপ্রে থাকার কথা।

আমি বললাম, ঠিক আছে উপরে তুলে দিচ্ছি!

কইলো, নাহ হবে না। আবার লাইন ধরে আসেন।

আমি বললাম, ভাইজান ! আবারো এক'শজনের পেছনে?

কইলো, অবশ্যই!

আমি কইলাম ছুটি-ছাটা অবশিষ্ট নাই, এট্টু দয়া করেন মেহেরবান!

কইলো, রহম করার জায়গা পাসপোর্ট অফিসে নাই!‍

অর্থ গ্রহনের রসিদখানি ফরমের নীচ থেকে উপরে তুলে আবার লাইনে দাঁড়ালাম।

আবারো শ"খানের মানুষের পেছন অতিক্রম করে পৌঁছালাম ক্ষমাবানদের কাছে।

আবারো দ্বিতীয়জন ফরম উল্টাইয়া কইলো, হইবো না!

আমি বললাম, কেনরে ভাই!

কইলো, প্রিন্ট নিছেন একপৃষ্টায়। উভয়পৃষ্টা প্রয়োজন।

আমি বললাম, আগেরবার বলেন নাই কেন?

কইলো, উত্তর দিতে বাধ্য নই!

আমি বললাম, রসিদ লাগানোর যে কথা বলছেন এবং এখন যা বলছেন এর কোনটাইতো নির্দেশনায় লেখা নাই। নির্দেশনায় লেখা, সাথে সংযুক্ত করুন আর প্রিন্ট নিয়ে অফিসে জমা দিন!

কইলো, নির্দেশনা লাগবো না, আমিই নির্দেশনা।

তারপর কী যেন ভাবলো! ভেবেচিন্তে পাঠালো বড়কর্তার রুমে।

বড়কর্তা রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে প্রতিটি পাতা উল্টাইয়া-পাল্টাইয়া কি যেন খুঁজলেন! বুঝলাম তিনি পান নাই!

তাচ্ছিল্যে চোখ না তুলে নাক সিটকালেন!

বললেন, হবে না। নতুন করে নিয়ে আসুন!

আমি বললাম,ছুটি-ছাটা নাই, মেহেরবানি করুন!

বড়কর্তা ফিরেও তাকালেন না।

আমি বললাম, স্যার ফর্ম একবার সত্যায়ন করতে অনেক কষ্ট হইছে। এ পর্যন্ত দু'বার করাইছি। আর বোধহয় করাবে না।

বড়কর্তার নড়াচড়া দেখে বুঝলাম পশ্চাৎদেশ দিয়ে কী যেন ছাড়লেন, তারপর বললেন, ওসব আমি বুঝবো না। যান প্লিজ!!

পেছনে এসে ভাবলাম। ভাবতে গিয়ে মাথা নস্ট হওয়ার অবস্থা। পুরো ফর্মটাই নষ্ট। আবারো নতুন প্রিন্ট, নতুন ছবি! আবারো সত্যায়ন! মাথা ঝিমঝিম করছে! এলাহি ভরসা!

আবেদন ফর্ম এরকম আরো কতবার যে পাল্টানো লাগছে আমার! বারবার প্রিন্ট, বারবার ছবি পাল্টানো, বারবার সত্যায়ন ! কষ্টের পাহাড় জমলো শরীরের চেয়ে মনে বেশী!

এ হারামখোরদের কথা বিস্তারিত লিখে লাভ নাই, সংক্ষেপে বলছি!

এ রকম বারবার ফর্ম পাল্টিয়ে শত কস্টে তিনদিন গিয়ে তিনবার ফিরে এসে অবশেষে দালালের ঘরে গেলাম।

সব শুনে দালাল কইলো, শিক্ষিত মানুষ! সামান্য বিষয়টা বুঝলেন না?

আমি বললাম, আমি কী বুঝি সেটা আমি জানি। তোমারটা তুমি করবা, টেকা-পয়সার কথা কও! উপদেশ খেলবা না!

দালাল কইলো, ভাইসাহেবেরা আপনার ফর্মে সিগনাল খুঁজছিলো!

আমি বললাম, সিগনাল কী?

দালাল কইলো, টাকা দেন, আইনা দেখায়!

ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে দালাল নিয়ে আসলে দেখি, ফর্মে ডিটেইলস শব্দটির উপরে ঠিক চিহ্ন দেয়া । এরকম প্রত্যেক পাতায় বিশেষ বিশেষ কিছু শব্দের উপর ছোট্ট ছোট্ট চিহ্ন দেয়া।

আমি বললাম, আর কোন সমস্যা নাইতো?

দালাল কইলো, কসম খোদার! আর কোন ঝামেলা নাই।

চতুর্থদিনে আমি দালালের আর্শীবাদ নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে আবারো গেলাম।

এবার ১মজন কী যেন বলে ২য়জনের কাছে দিল।

২য়জন সন্দেহমাখা চোখে কইলো, হইল না।

১মজন শান্ত চোখে ২য়জনকে কইলো, লইয়া ল!

২য়জন একটা রুম নাম্বার লিখে কইলো, ওখানে যান!

রুম নাম্বারে গিয়ে দেখি কেউ নাই ওখানে!

এখানে ১মজন হইলো কর্তা আর ২য়জন হইলো কর্তার চামচার মতো একজন।

আবারো ঘুরাঘুরি দেখে মনে সন্দেহ জাগল আমার। ফোন দিলাম দালালের নাম্বারে। দালাল ফোন দিল বড় দালালের নাম্বারে। বড় দালাল বোধহয় আমারে চিনে ফেলছে। পড়িমরি করে ফোনে জানালো, আনসার সদস্য জিয়ার সাথে একটু কথা কন প্লিজ! ওরে আমি পাইতাছি না।

আনসার জিয়াকে খুঁজতে খুঁজতে যারে পাইলাম, তিনি হলেন ২য়জন চামচা টাইপের লোকটি।

২য়জন আমার মুখে তার লা-বাবা; দালালের নাম শুনে হাসলেন।

এবার কইলেন, কোন সমস্যা নাই এবার, স্যারের রুমে যান।

স্যারের রুম মানে?

বামে বড়কর্তার রুম।

স্যারের রুমে গিয়ে দেখি ; গল্পের শুরুতে বলা বড়কর্তা। যিনি কাল আমাকে রুম থেকে বের করে দিছিলেন। দালালের সিগনাল নিয়ে যাওয়াতে তিনি আজ এট্টু কদর দেখাইলেন।

মুখে বলতে পারি নাই, ‍.... বাচ্চা।।

বরং স্যার ডেকে বললাম, অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার আপনাকে!

আর কোন সমস্যা হয় নাই! কারণ যে আনসার সদস্যের দরজায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের কথা, তিনি করছেন শিক্ষিত ভদ্রলোকের কাজ।

মাথায় আসে না, একজন আনসার বা নিরাপত্তারক্ষী কিভাবে কাউন্টারে বসে ফর্ম গ্রহণ করছেন? কিভাবে ফর্মের ভুলত্রুটি নির্ণয় করছেন? প্রকাশ্যে হয়রানি করছেন সেবাপ্রার্থীদের?

শুনলাম, আনসার জিয়া নাকি সারা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এরকম ৪০/৫০ জন দালালের প্রতিনিধি। তার মাসিক ইনকাম শুনে মাথা ঘুরে যাবার অবস্থা! শহরে জমি কিনে বাড়িও করে ফেলেছেন সামান্য এই নিরাপত্তাকর্মী।

দালালের আর্শীবাদ আছে সাথে, সমস্যা হওয়ার কথা নয়!

দালাল ফোনে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোন সমস্যা আছে ভাই?

আমি বললাম, নাই!

দালাল বললেন, দেখেন আমার ক্ষমতা! ফাউ কাজ করার মানুষ আমি না! টাকা নিব, কাজ করবো! বরখেলাপ নেই কোন!

এরপর শুরু হলো পুলিশ পর্ব। ওখানে নাকি দরদাম করা আছে। সে এক ইতিহাস! লোকজন বলে, বলে কী লাভ! ভাবলাম আসলে লাভ নাই! একটি জনযুদ্ধের পর পাওয়া স্বাধীনতা কী আমজনতার? নাকি হাতেগুনা কয়েকজনের?

দালাল বলেন, রেট করা আছে, সমস্যা নাই। কোথাও সমস্যা নাই। সবকিছু নিয়মে চলছে, সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

১ম পুলিশ ভদ্রতার সাথে কাজটি করে দিলেন, যদিওবা আমি দিলাম কিছু.....!

২য় পুলিশ: জেলা পুলিশের দরবারে পৌঁছে দেখলাম, সম্পুর্ণ ব্যবসায়িক পরিবেশ। পুলিশ অফিসারটি তরুণ ও স্মার্ট।

এতা সুন্দর চেহারা ঘুষ দিতে আমার লজ্জা লাগছিল! অফিসার লজ্জ্বা ভেঙ্গে দিয়ে বললেন, আরো অনেক টাকা লাগবে। বাড়াইয়া দেন! আপনারা শিক্ষিত মানুষ বুঝেন না কেন?

আমি বললাম ভাই এ ক'দিনে যা বুঝেছি, পুরা শিক্ষা জীবনে তা শিখি নাই! দেন একটু জ্ঞান গরিমা দেন! লইয়া মানুষ হই! তারে পুরো ইতিহাস শুনাইয়া কইলাম, দেশে আমরা কী কামে আছি? আপনাগো সেবায়?

অফিসার বলেন, বাড়াইয়া না দিলে কাজ হবে না।

আমি বললাম, পাসপোর্ট নিবো না। যা ইচ্ছা তাই করেন! আর বাড়াইতে পারমু না!

অফিসার কী ভেবে বললেন, ওকে কইরা দিমু! আল্লা হাফেজ! ভালা থাকবেন!

যুদ্ধশেষে দালালের সহায়তায় সৎপথ ত্যাগ করে বিকল্প পথে পাসপোর্ট নিতে হলো আমার মতো একজন সৎ নাগরিকের! দুঃখ শুধু এখানেই!!!!!

 

Topics:

পাসপোর্ট অফিসের বড়কর্তা

Login to comment login

Latest Jobs