Posted By

দক্ষিণ বাংলার নদ-নদীর সম্ভাবনা

Fashion 31

নদীর তীর ভূমিতেই মানব সভ্যতার গোড়াপত্তন। মানবজীবনের প্রাণচাঞ্চল্যে তাই নদীর প্রবাহমানতা উপলব্ধ। এ প্রবাহই জীবন, এ প্রবাহই শক্তি। নদীর কাছে মানুষ ঋণী। পৃথিবীতে নদীই ছিল মানুষের জীবন ধারনের উৎকৃষ্ঠ অবলম্বন। নদী মানুষ, গাছপালা ও প্রাণীর বাসযোগ্য জায়গা গড়ে তোলে.. তাই আদিকাল থেকে মানুষ যেখানে পানির সন্ধান পেয়েছে সেখানেই বসতি স্থাপন করেছে। ফলে মানুষের সভ্যতার সেই প্রথম সঙ্গী এই নদী। আর নদীর কুল ঘেঁষে সার্থক মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। তাই নদীকে মানুষের জীবনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। নদীর উদারতা ও উপকারিতা থেকে মানুষের অনেক কিছু শেখার আছে। নদীর জীবনের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে মানুষের জীবন মিলে মিশে একাকার। নদীর চলার পথ সুদীর্ঘ এবং বিস্তৃত। এ সময় তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় মানুষ। নদীও একাত্ম হয় তার সাথে জীবনের তাগিদে। নদীর দুপার ধরে গড়ে ওঠে মানুষের বসতি, ছবির মতো সাজানো গ্রাম আর প্রাসাদ অট্টালিকায় ভরা শহর ও বন্দর। মানুষের সভ্যতাকে এগিয়ে নেবার প্রধান বাহক হিসেবে নদীর অবদান তাই অনস্বীকার্য। নদী যেমন মায়ের মতো তেমনি নদী ছাড়া নদীর জল ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা কঠিন। ফলে আমরা নি:সংকোচে বলতে পারি দক্ষিণ বাংলা শব্দটির সমার্থক তার বুক চিরে বয়ে চলা অসংখ নদ-নদী। আর এ নদ-নদীকে কেন্দ্র করেই প্রনোয়ন হয়েছে আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সম্ভাবনা ‘রূপকল্প-২০৪১’ এবং ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’। 

নিম্নে দক্ষিণ বাংলার সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হলো: 

১। কুঁচে রপ্তানি:  

দক্ষিণ বাংলার মাটি, পানি ও আবহাওয়া কুঁচে চাষের জন্য বেশ উপযোগী। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে এ মাছটি বিলুপ্ত প্রায়। তবে আনন্দের বিষয় হলো P.K.S.F এর সহায়তার বাণিজ্যিকভাবে এ মাছের উপাদান সাতক্ষীরা জেলারি শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ এবং খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলায় কুঁচু চাষ শুরু হয়। তবে সম্প্রতি ইহা অন্য জেলাগুলোতের প্রসারিত হয়েছে। প্রতি কেজি কুঁচে বিক্রি হয় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় কিন্তু ইহার দাম নির্ভর করে তার আকারের উপর। দক্ষিণ-বাংলার কুঁচে রপ্তানি করা হয়, ‘চীন, জাপান, হংকং, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, কোরিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। তবে শতকরা ৯০ ভাগই যায় চীনে।

২। কাঁকড়া রপ্তানি:

কুঁচের মতো পানির অপর একটি প্রাণী কাঁকড়া। যা নদ-নদী বিধৌত দক্ষিণ বাংলার সকল জেলাসমূহ এবং উপকূলীয় এলাকায় প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়। কারণ ‘একটি স্ত্রী কাঁকড়া একবারে প্রায় ১৫ লাখ ডিম পারে। এ ১৫ লাখ ডিমের মধ্যে শতকরা ৫ থেকে ৭ ভাগ বাচ্চা জন্ম নেয়। তাই প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ টন কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। চীনে কাঁকড়া অতি জনপ্রিয় খাবার ফলে প্রায় ৯০ শতাংশই রপ্তানি হয় সেখানে। পাশাপাশি জাপান, তাইওয়ান ও থাইল্যান্ডে কাঁকড়া রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা ও পাইকগাছাতে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে খামার গড়ে তোলার মাধ্যমে বেকার সমস্যার সমাধান করছেন। 

৩। নদীজ খনিজ সম্পদ:

 খনিজ একটি প্রাকৃতিক অজৈব পদার্থ। ইহার মধ্যে রাসায়নিক এবং ভৌত গুনাবলী বিদ্যমান। সাধারণত খনিজ পদার্থ দুই ধরনের হয়ে থাকে। যথা ধাতব ও অধাতব খনিজ। ‘সারা বিশ্বে ধাতব ও অধাতব মিলিয়ে প্রায় ২০০০ ধরনের খনিজ সনাক্ত করা হয়েছে। দক্ষিণ বাংলার নদ-নদীতে কেবলমাত্র অধাতব খনিজ পদার্থেরই সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।

নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। যথা- 

ক. কাঁচ তৈরির কাঁচামাল আহরণ:

বর্তমানে দক্ষিণ বাংলার অধিকাংশ নদ-নদী বালিতে পুঞ্জীভূত হয়ে ধুকে ধুকে মরছে। কিন্তু যদি এই সঞ্চিত বালিকে সঠিকভাবে নদ-নদী থেকে আহরণ করা হয়, তবে তা শিল্প কারখানায় কাঁচ তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। ভূতত্ত্ব জরিপ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের তথ্যমতে ‘প্রতি টন বালুতে কাঁচ তৈরির উপাদান সর্বোচ্চ পরিমান কোয়ার্টজ সিলিকা ৫০ কেজি, ইলমিটাইট ৬০০ গ্রাম, জিরকন ৪০০ গ্রাম, রুটাইল ৪০০ গ্রাম, গার্নেট ২ কেজি ৫০০ গ্রাম ও মোনাজাইট ১০০ গ্রাম আছে। যার মোট চলতি বাজারমূল্য ৩ লাখ ২০ হাজার ৮৯২ টাকা। অর্থাৎ ১ টন বালু থেকে ৫৪ কেজি খনিজ উপাদান আলাদা করে বিক্রয় করলে সরকার পাবে সোয়া ৩ লাখ টাকা। বাকি বালু নতুন ভূমি গঠনে ও ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের পুনর্বাসনে ব্যবহার করা যায়। 

খ. মোনাজাইট:

দক্ষিণ বাংলার সৈকত প্লেসারের মধ্যে সামান্য পরিমানে সোনাজাইট লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে কুয়াকাটা উল্লেখযোগ্য। ইহা মজুদের পরিমান প্রায় ‘১৭৩৫২’। মোনাজাইট ‘তেজস্ক্রিয় খনিজ পদার্থ, যা পারমানবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়া ইহা এটম বোমা তৈরির কাঁচামাল এবং কালার টেলিভিশন ও গ্যাস প্লান্টে ব্যবহৃত হয়। 

গ. নির্মাণ কাজের বালি সরবরাহ:

উত্তর বাংলা হতে দক্ষিণ বাংলার দিকে প্রবাহিত নদীগুলো ক্রমাগতভাবে বালির স্তর জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এই বালি ‘প্রধানত মাঝারী থেকে মোটা দানাদার কোয়ার্টজ সমন্বয়ে গঠিত’। যা আবাসস্থল, সেতু রাস্তাসহ নানাবিধ উন্নয়নে কর্মকান্ড পরিচালনা করতে আবশ্যকীয়। ফলে এই বালি যেমন একদিকে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছে, তেমনি উহা উত্তোলনের মাধ্যমে আমাদের মৃত নদীগুলো জীবন্ত হয়ে উঠবে। 

ঘ. পিট কয়লা:

দক্ষিণ বাংলার নদ-নদী বেষ্ঠিত জলাভূমিতে পিট কয়লার মজুদও রয়েছে। ইহার মোট মজুতের পরিমান ১৭ কোটি টনের বেশি। তাপোৎপাদক মান পাউন্ড প্রতি ৬০০০ থেকে ৭০০০ বিটিইউ। গার্হস্থ্য কাজে ইটের ভাটায় বয়লারের জ্বালানি হিসেবে পিট ব্যবহৃত হয়।

ঙ. সৈকত বালি:

দক্ষিণ বাংলার নদ-নদী ঘেষা উপকূলীয় বলয় ও দ্বীপগুলোতে বিবিধ প্রকারের রাসায়নিক সৈকত বালি পাওয়া যায়। এই সৈকত বালিতে বিভিন্ন ধরনের ভারী মানিকের মজুত রয়েছে। যেমন জিরকন (১,৫৮,১১৭ টন), রুটাইল (৭০,২৭৪ টন), ইলমেনাইট (১০,২৫,৫৫৮ টন), লিউফক্সিন (৯৬,৭০৯ টন), কায়ানাইট (৯০,৭৪৫ টন), গারনেট (২,২২,৭৬১ টন) ম্যাগনেটাইট (৮০,৫৯৯ টন)’।

Topics:

দক্ষিণ বাংলার নদ-নদীর সম্ভাবনা

Login to comment login

Latest Jobs