উঠান-বৈঠক /পান-সল্লা’ হয়ে উঠতে পারে মহল্লা ভিত্তিক গ্রামীণ সংসদ

Education 3

আগেকার সমাজ ব্যবস্থায় পাড়া মহল্লায় “পান-সল্লা” নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। “পান-সল্লা” মানে দশজন একত্র হয়ে পান খাওয়া আর গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নিয়ে সল্লা করা। বিয়ে, মেজবান, ছেলের আকিকা অনুষ্ঠান কিংবা বড় কোন সামাজিক সংকট মোকাবেলায় পূর্ববর্তী প্রস্তুতি নিতে মহল্লার লোকজন বসে যে পরামর্শসভা করতেন তাহাই “পান-সল্লা”। মুলত: এধরণের পরামর্শ সভায় পান দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো বলেই নামকরণ হয় পান-শল্লা। সাধারণত: পান-সল্লা বাড়ীর আঙিনা বা উঠানেই সম্পন্ন হয়। তবে কোথাও কোথাও কাচারীঘর বা দেউরিঘরেও এধরণের বৈঠক বসে থাকে। যুগ পাল্টেছে, পাল্টেছে সমাজ ব্যবস্থা, বাড়ছে ব্যস্ততা। মহল্লার দশজন একত্র হওয়ার সুযোগও দিনদিন কমে আসছে। তাছাড়াও সমাজে পারস্পরিক সম্প্রতির সংকট, বড়দের প্রতি সন্মান প্রদর্শনসহ আবহ বাংলার সমাজ ব্যবস্থার বহু নিয়মনীতি ও মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে অহরহ। এতে করে একই সমাজে বসবাসকারী সকলেই একসাথে বসবাস করলেও পরস্পর দুরুত্ব বাড়তে থাকে। সামাজিক সৃষ্ট দুরুত্ব এক পর্যায়ে এধরণের বন্ধন বা একত্র হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শীতিল করে দেয়। ফলে দেখা যায় যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার গড়ে উঠছে বেশী। এতে করে পরিবারে শিশু নিরাপত্তা যেমন এবং অনন্দময় শৈশব যেমন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে তেমনি অশ্রদ্ধা ও অসহায়ত্বের মুখোমুখি হচ্ছে সমাজের প্রবীণ জনগোষ্ঠি। এধরণের বিভিন্ন কারণে দেখাযায় আধুনিক সমাজব্যবস্থায় নানাধরণের নতুন নতুন সামাজিক সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে- যা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন আইন-শৃংখলা বাহিনীও বড়ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। আগে বাড়ী মহল্লার যে সমস্যাগুলো সমাজের সর্দার মাতবরেরা নিজেরা বাড়ীর আঙিনায় বসে সহজে সমাধান করতে পারতেন তা এখন যুগের পর যুগ বিভিন্ন আদালতে গড়িয়েও সমাধানের রাস্তা খুঁজে পায় না। ফলে সমাজে শত্র“তা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে বেপরোয়া সহিংসতা। সহিংসতা জন্ম দিচ্ছে নানাধরণের জটিল অপরাধ। বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী এবং গবেষকেরা মনে করেন বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় আমাদের কৃষ্টি ও মানসিকতা উপযোগী প্রাচীন প্রচলিত সামাজিক মুল্যবোধ ও নিয়মনীতিগুলোই ফিরিয়ে আনতে পারে শান্তি ও সহনশীলতা। 

সম্প্রতি দেখা যায় প্ল্যান ইনাটারন্যাশনাল এর নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রটেক্টটিং হিউম্যান রাইটস প্রকল্প (পিএইচআর), মর্যাদাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় বাস্তবায়নাধীন পিকেএসএফ এর সমৃদ্ধি ও একই আদলের আরো বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সেই ‘পান-সল্লা’ ব্যবস্থাকে একটি ফরমাল কাঠামোতে এনে গ্রামীণ পর্যায়ে উঠান-বৈঠকে রূপান্তর করে ভাল ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। এখানে উঠান-বৈঠক উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে বড়ধরণের নিয়ামক হিসেব কাজ করছে। বলা যায় সেই প্রাচীন ‘পান-সল্লা’র আধুনিক সংস্করণ হলো উঠান-বৈঠক। উঠান-বৈঠক মহিলা পুরুষ আলাদা আলাদা বা সম্মিলিতভাবেও করা যায়। আবার দেখা যায় পাড়া মহল্লায় অবস্থিত ছোট্ট ছোট্ট চা-দোকানেও উঠান বৈঠক সম্পন্ন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে পল্লীঅঞ্চলের চা-দোকানগুলো এলাকার সংকট ও সমস্যা দুরীকরণে উঠান-বৈঠক কার্যক্রমের সচিবালয়ও হয়ে উঠতে পারে। উঠান-বৈঠক শুধুমাত্র সংকট সমাধানে নয় বরং মহল্লার পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রতি, উন্নয়ন ও চেতনা বির্নিমানেও কার্যকর ভুমিকা রাখতে সক্ষম। এলাকার সমস্যা চিহ্নিতকরণ, সমাধানে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ, সচেতনতা সৃষ্টি প্রভৃতি কাজে এটি সংসদ হিসেবে কাজ করতে পারে।

উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে উঠান-বৈঠকের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় ঘাসফুল বাস্তবায়নাধীন পিএইচআর প্রকল্পের কার্যক্রমে বাড়ীতে বাড়ীতে উঠান বৈঠকের আয়োজন করে স্থানীয় নারীদের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়েছে। তাছাড়াও বহুমাত্রিক উন্নয়ন কর্মসূচী সমৃদ্ধি কর্মসূচীর হাটহাজারীস্থ মেখল ও গুমান মর্দ্দন ইউনিয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কার্যক্রমেও উঠান-বৈঠকের অভাবনীয় সাফল্য পরিলক্ষিত হয়েছে। উঠান-বৈঠক আর্কষণীয় করতে সেখানে বিভিন্ন খেলাধুলা, কৌতুকসহ নানারকম অভিনব কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। ফলে এসব উঠান বৈঠক সংকট নিরসনের পাশাপাশি বিনোদনেরও একটি মাধ্যম হয়ে উঠে। সমৃদ্ধি কার্যক্রমে দেখা যায় উঠান বৈঠকগুলোতে যেমন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা সন্তানদের ভবিষ্যত গড়ার পরিকল্পনা করছে তেমনি তাদের শারিরীক ও মানসিক সমস্যা নিয়ে পরস্পর আলোচনা হচ্ছে এবং সমাধানের নানাধরণের পথও খুলে যাচ্ছে। উঠান-বৈঠকের ফলে মহল্লায়-মহল্লায় জনসাধারণের মাঝে যেমন আন্ত:সম্পর্কের উন্নয়ন হয় তেমনি প্রশাসন, জনপ্রতিনিধির সাথেও একটি নিবিড় সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। এপদ্ধতির মাধ্যমে অন্যতম অত্যন্ত স্বল্পব্যয়ের মাধ্যমে অনেক বড় বড় সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব হয়ে উঠে। উঠান বৈঠকের ফলে যে কোন উন্নয়নে কার্যক্রমে স্থানীয় জনসাধানণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় এবং এক্ষেত্রে মনিটরিং ব্যবস্থাও জোরদার হয়।

এক্ষেত্রে উঠান বৈঠকগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় গণতান্ত্রিক উপায়ে একজন নির্বাচিত সমন্বয়কারী / প্রতিনিধি ঠিক করাসহ প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সকলের মতামত নেয়ার পদ্ধতি চালু করা সম্ভব হলে অবশ্যই এব্যবস্থা টেকসই ও কার্যকর ভুমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এধরণের কার্যক্রম ফলপ্রসু করতে একটি জাতীয় পর্যায়ের পরিচালন কাঠামো প্রস্তুত করে এবিষয়ে কমিউনিটি লিডার, জনপ্রতিনিধি ও মহল্লার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের মোটিভেশন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। উঠান-বৈঠক কার্যক্রম প্রসারে সকল সুযোগ-সুবিধাগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। এসকল কাজ সফলতার সাথে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে নিঃসন্দেহে আগামীতে এই উঠান-বৈঠকের মাধ্যমেই স্থানীয় সম্পত্তি বিরোধ ও সামাজিক বিরোধ নিস্পত্তি, ফৌজদারী অপরাধ নিয়ন্ত্রণসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও কৃষিসহ বিভিন্ জাতিয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অত্যন্ত স্বল্পব্যয় ও সহজ উপায়ে অভাবনীয় ইতিবাচক ভুমিকা রাখা সম্ভব হবে। উঠান বৈঠকগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় জনসাধারণের হয়তো বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে তারা নিজ উদ্যোগে বিশেষজ্ঞ মতামতও নিতে পারেন। যেমন কোন আইনি জটিলতা সমাধানে তারা এবিষয়ে সহায়তা দানকারী সরকারী-বেসরকারী সংস্থা বা কোন বিশেষজ্ঞ আইনজীবিকে বৈঠকে নিমন্ত্রণ করতে পারেন। অনুরূপভাবে কৃষি, পশুসম্পদ কিংবা অন্যান্য যেকোন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারী সহায়তা প্রদানকারী দপ্তর কিংবা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধিনিধিকে নিমন্ত্রণ করা যায়। এতে করে বিভিন্ন বিষয়ে কর্মরত সরকারী-বেসরকারী সংস্থা/দপ্তরের সাথে স্থানীয় সাধারন জনগণের সাথে যোগাযোগ স্থাপন হবে। এভাবে সঠিক উপায়ে কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হলে কয়েকবছর পর দেখা যাবে এসকল বহুমুখী কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উঠান-বৈঠকগুলোন মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সচেতন উন্নয়নক্ষেত্রে গড়ে উঠবে, যা জনগনের ক্ষমতায়নসহ স্থানীয় উদ্যোগে তাতের বিভিন্ন ছোট ছোট সমস্যা সমাধানের একটি কার্যকর উপায় হয়ে উঠবে। 

------সৈয়দ মামুনূর রশীদ

 

Topics:

উঠান-বৈঠক /পান-সল্লা’ হয়ে উঠতে পারে মহল্লা ভিত্তিক গ্রামীণ সংসদ

Login to comment login

Latest Jobs