মূল : ললিতা by ভ্লাদিমির নবোকভ অনুবাদ : রনক জামান (১ম কিস্তি)

Education 11

ললিতা ভ্লাদিমির নবোকভ  

ভাষান্তর: রনক জামান             

                          

অনুবাদকের ভূমিকা    

 

ল-লি-তা; গত শতকের নিষিদ্ধ উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি নাম। একইসাথে বিগত শতাব্দীর সেরা উপন্যাসগুলোর একটি। বিখ্যাত রুশ ঔপন্যাসিক ভ্লাদিমির নবোকভের (১৮৯৯-১৯৭৭) এক অনবদ্য সৃষ্টি ‘ললিতা’। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৫৫ সালে প্যারিসে ইংরেজি ভাষায়, এরপর ১৯৫৮ সালে নিউ ইউর্ক সিটিতে এবং ১৯৫৯ সালে লন্ডনে। প্রকাশের কিছুকাল পরেই যৌন বিষয়বস্তুর অসুস্থ উপস্থাপনা বলে আখ্যায়িত করে উপন্যাসটিকে বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ১৯৬৭ সালে ভ্লাদিমির নবোকভ নিজেই রাশিয়ান ভাষায় উপন্যাসটি অনুবাদ করেন।  উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ললিতা। যার পোশাকি নাম ডলরিস হেইজ। ৩৭-৩৮ বছর বয়স্ক সাহিত্যের প্রফেসর, কবি ও গবেষক ড. হামবার্ট হামবার্টের নিজের জবানিতে ললিতাকেন্দ্রিক তাঁর পুরো জীবন উপাখ্যান তুলে ধরেন। সম্পূর্ণ কাহিনীটি ড. হামবার্ট হামবার্ট জেলখানায় বসে মৃত্যুর কিছুদিন আগে লিখে শেষ করেন। ‘ললিতা’ তাঁরই দেয়া নাম। যিনি ‘নিমফেট’ মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ এড়াতে না পেরে নিজেকে প্রায়ই অসুস্থ বলে সন্দেহ করতেন। চিকিৎসার জন্য স্যানিটোরিয়ামে যেতে হতো। এক পর্যায়ে ১২ বছর বয়সী ললিতার প্রেমে পড়লে দ্বিধান্বিত হয়ে সমাজব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। একজন নার্সিসিস্টিক মেধাবী লেখক, নিজেকে নিয়ে গর্বিত, একইসাথে রসিক, শব্দ নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন, আত্মসমালোচক এবং unreliable narrator তিনি, তাঁর জবানিতে পাঠক আস্থা রাখবেন কি রাখবেন না সেই দোলচালে দুলতে হয়। উপন্যাসটি পড়া শেষে প্রশ্ন জাগে, তাঁর চরিত্র কি খল? নাকি ইতিবাচক চরিত্র? 

 

তাঁর মতোই আরেকটি প্রধান চরিত্র রয়েছে, যাকে তিনি নিজের ছায়া বলে পরিচয় করিয়ে দেন, এবং দাবি করেন সেই লোকটি তাঁর মতোই মেধাবী, কিন্তু তাঁর খারাপ দিকের সমন্বয়ে তৈরি।  উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘ললিতা’ যৌনতার একটি প্রতীক হিসেবে পরিচিত আছে, অথচ সে ছিল ১২ বছর বয়সী একজন সাধারণ মেয়ে। যার ভেতরে ড. হামবার্ট হামবার্ট অসাধারণ নিমফেটিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পান, নিমফেট বলে আখ্যা দেন, এবং শৈশবে আটকে থাকা প্রেমের অনুভূতি, প্রেমিকার কথা মনে পড়ে যায়। সার্বিক বিবেচনায়, অসম বয়সের দুজনের প্রেমের বিষয়বস্তু সামাজিক প্রেক্ষাপটে অগ্রহণযোগ্য হওয়ায় একে অশ্লীল মন্তব্য করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অথচ ভ্লাদিমির নবোকভ তাঁর দূর্দান্ত লেখনীতে, সেন্স অব হিউমারের চমৎকার ছোঁয়ায় এই যৌনতাকে অসামান্য বোধের পর্যায়ে তুলে ধরেছেন। যেখানে অশ্লীলতা স্থান পায়নি, বরং শিল্প সৃষ্টি হয়েছে, কামনা জাগেনি, কান্না পেয়েছে। 

 

একজন অনুবাদকের সেখানে কাজ কতটুকু? অনুবাদকের ভূমিকাই বা কী? শুধু কি এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় রূপান্তর? নাকি অনুভূতি, লেখনীর স্বর, শিল্প সঠিকভাবে প্রতিস্থাপন করা? উপন্যাসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বোধ থেকে সরে যাবার অধিকার অনুবাদকের নেই। অপরদিকে কেবল অক্ষর গুনে গুনে ভাষান্তর করাটাও ভীষণ অন্যায়। এক কথায়, মূল উপন্যাসের প্রাণ কবজ করে আবার নতুন এক দেহে, নতুন চেহারায় প্রতিস্থাপনাই অনুবাদকের লক্ষ্য। প্রাণ নিয়ে খেলা, এ তো যেনতেন কথা নয়।  সাবলীল পাঠযোগ্যতার খাতিরে তাই ভাবানুবাদই বেছে নিতে হয়েছে। মূল উপন্যাসে অনেক ফ্রেঞ্চ লাইন ছিল। পাঠকের সুবিধার্থে সেগুলোকে বাংলায় তর্জমা করা হয়েছে। রাশিয়ান ভাষায় অনূদিত ‘ললিতা’র সাহায্যও নিতে হয়েছে। আমেরিকার ভূগোল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে। তাই সহায়িকা হিসেবে আমেরিকান বিভিন্ন ভূগোল বইয়ের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।  

 

ললিতা উপন্যাসটি কেবল নিষিদ্ধ প্রেম, প্রণয় বিষয়ক নয়। বরং এটি আদর্শ মনস্তাত্বিক গবেষণাগ্রন্থ হিসেবেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। শিল্পে কখনো অশ্লীলতা থাকে না, অশ্লীলতা থাকে আমাদের মগজে। অপরদিকে স্রেফ অশ্লীলতাকেও আমি শিল্প বলতে রাজি নই। সেই হিসেবে বইটি নোংরামিমুক্ত। এবং ভ্লাদিমির নবোকভের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে তাঁর অমর সৃষ্টি ললিতাকে পাঠকের হাতে তুলে দিতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত।    

 

রনক জামান       

 

 

ভূমিকা     

 

‘‘ললিতা অথবা এক বিপত্নীক শ্বেতাঙ্গের স্বীকারোক্তি,’’ এই শিরোনামে দুটো অদ্ভুত নোট হাতে পেলাম একদিন। যার লেখক ‘হামবার্ট হামবার্ট’ নামে এক ভদ্রলোক, পুলিশের কাছে বন্দী থাকা অবস্থায় গত ১৬ নভেম্বর ১৯৫২ সালে হৃদযন্ত্রের সমস্যায় (করোনারী থ্রম্বোসিস) মারা যান। কিছুদিন আগেই তাঁর বিচারের কাজ শুরু হবার কথা ছিল। তাঁর আইনজীবী ক্ল্যারেন্স সি. ক্লার্ক (বর্তমান কলম্বিয়া জেলা বারে কর্মরত আছেন) আমার বেশ ভাল বন্ধু ও আত্মীয়, ঘনিষ্ঠতার সুবাদে এই খসড়া নোটগুলো আমাকে সম্পাদনা করতে বললেন। যতটুকু জানতে পারলাম, লেখকের শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁর মৃত্যুর পর এই খসড়াগুলোকে যেন বই আকারে প্রকাশ করা হয়। বই হিসেবে প্রকাশ উপযোগী করতে যে কোনো রকম সম্পদনার অধিকার মি. ক্লার্ককে সম্পূর্ণভাবে দেয়া ছিল। আর মি. ক্লার্ক এসে দায়িত্বটা আমাকে দিতে চাইলেন। উনার এমন প্রস্তাবে প্রথমে কিছুটা অবাকই হলাম। কারণ তিনি এমন একজনকে সম্পাদক হিসেবে পছন্দ করেছেন (আমাকে অবশ্যই) যে কিছুদিন আগে পলিং পুরস্কার পেয়েছিল। আর সেখানকার আলোচ্য বিষয় ছিল বিকৃত মনস্তত্ব ও অসুস্থ কামনা।  

 

যতটা ভেবেছিলাম তত কঠিন ছিল না কাজটা। শুরু করে দেখলাম প্রত্যাশার চেয়ে অনেক সহজ ও সাবলীল। সংশোধনের পরে পরিবর্তন করার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না আমার। সেটাও অনেক সতর্কতার সাথে করতে হলো। বলতে গেলে, সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপিতে ‘হামবার্ট হামবার্ট’ এর নিজস্ব স্বাদ ও ছাপ ছিল। আর পুরো গল্পটাই ছিল তাঁর নিজস্ব অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং এমন কিছু করার সুযোগ ছিল না, যাতে তাঁর নিজস্বতাগুলো সামান্যতম ম্লান মনে হয়। গল্পের চরিত্রগুলোর ছদ্মনাম ব্যবহারের অনুমতি ছিল। তবে লেখক এই উপন্যাসের বিশেষ একটি নাম পরিবর্তন না করতে অনুরোধ করে যান। ‘হেইজ’ নামটা উপন্যাসের নায়িকা চরিত্রের পদবী। আর নায়িকার প্রথম নাম তো স্পষ্টতই উপন্যাসের নামটিই ললিতা। লেখকের কাছে এই নামটা এতই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যে, কোনো নামেই একে পরিবর্তন করার অনুমতি ছিল না আমদের। ‘হেইজ’ এর ‘এইচ’ শব্দটা থেকেই যে লেখক তাঁর ছদ্মনাম ‘এইচ এইচ’ ব্যবহার করেছেন সেটাও আন্দাজ করে নিতে কষ্ট হয়নি। অবশ্য এই নামটাকে পরিবর্তনের কোনো কারণ বা ইচ্ছাও ছিল না আমার। ফলে লেখকের ইচ্ছা অনুযায়ী নামটা অপরিবর্তিতই থেকে যায়। সম্পাদনা করার সময় ‘হামবার্ট হামবার্ট’ এর অপরাধ ও সমস্ত ঘটনাটি বোঝার জন্য ১৯৫২ এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের খবরের কাগজগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয় আমাকে। তাঁর কিছু কিছু ঘটনা তখন খবরের কাগজে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিল।  

 

আমার ভয় ছিল অন্যখানে। লেখকের ঘটনা ও চরিত্রগুলো সরাসরি উপস্থাপন করাটা তাঁর আত্মীয় ও পরিচিতদের জন্য অসম্মানজনক হয়ে যেতে পারে। তাই হামবার্ট হামবার্ট ভদ্রলোকের আত্মীয় বা পরিচিতদের কথা ভেবে অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে হয়। রামসডেল থেকে মিঃ উইন্ডমুলার এর পাঠানো কিছু তথ্য যাচাই করে চরিত্রগুলোকে খানিকটা অন্যভাবে, অন্য নামে উপস্থাপন করতে হলো আমাকে। অনেক পাঠককেই দেখা যায় উপন্যাসের চরিত্রের পেছনের আসল চরিত্রগুলোকে খুঁজে নিতে আগ্রহী থাকে। তাদেরও সম্পূর্ণ নিরাশ না করে বেশ জটিলতার সাথে পাণ্ডুলিপিটা সম্পাদনা করলাম। মিঃ উইন্ডমুলারের তথ্যগুলো হাতে পাবার পরে লক্ষ্য করলাম উনার মেয়ে ‘লুইস’ এখন কলেজে অধ্যায়নরত। ‘মোনা ডাল’ নামে প্যারিসে তার এক ছাত্রী আছে। ‘রিতা’ বর্তমানে ফ্লোরিডায় এক প্রভাবশালী হোটেল মালিকের স্ত্রী। আর ‘মিসেস রিচার্ড এফ শিলার’ ১৯৫২ এর বড়দিনে মেয়েশিশু জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছেন। ‘ভিভিয়ান ডার্কব্লুম’ সংক্ষিপ্ত  আকারে একটি লেখা প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেল। লেখাটার নাম ছিল, ‘আমার কুই’। ‘কুই’ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্রের ডাকনাম। সবকিছু বিবেচনা করে যেসব তথ্যে তাদের পরিবারের দুর্নাম হতে পারে আর সমাজের কাছে তাদেরকে আপত্তিকর করে তুলতে পারে সেগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে হলো।  

 

শেষমেশ সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম কিছুটা বাস্তবতা ছেঁটে ‘ললিতা’ কেবলমাত্র একটি আবেগময় উপন্যাস হিসেবেই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেব। সত্যি বলতে কী পুরো পাণ্ডুলিপিতে একটা সামান্য বিষয়ও আমার কাছে অশ্লীল মনে হয়নি। কোনো বাজে শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। তবুও পাণ্ডুলিপিটা যাতে বই আকারে প্রকাশ না পায়, সেজন্য অনেকেই মাথা নাড়া দিয়ে ওঠে। খুব সহজেই অনেকে অনেক আপত্তি তোলে। তাদের দাবি ছিল উপন্যাসটা সম্পূর্ণই অশ্লীল ও অসুস্থ মানসিকতার। এটা উপন্যাস হিসেবে দেখা হলেও উপন্যাসের মানসিকতার সাথে পর্নগ্রাফির কোনো পার্থক্য নেই। একে প্রকাশ করা ঠিক হবে না।  হতে পারে উপন্যাসটিতে অনেকের রুচিগত আপত্তি রয়েছে। আমার নিজেরও নোটগুলো পড়ে অনেকবার মনে হয়েছে হামবার্ট হামবার্ট ভদ্রলোকের কিছু কর্মকাণ্ড ও চিন্তা-ভাবনা খুবই হাস্যকর ও ঘৃণার যোগ্য। তবু তাঁর নিজস্ব গল্পের ভঙ্গি ও আঙ্গিক পরিবর্তনের পক্ষে আমি ছিলাম না। এই ব্যাপারগুলো পরিবর্তন করতে গেলে উপন্যাসের পুরো বিষয়বস্তুতেই আমার হস্তক্ষেপ করতে হতো। তাছাড়া সম্পূর্ণ উপন্যাসটিই এক অসাধারণ সৃষ্টি, মনস্তাত্বিকভাবে একজন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির চরিত্রের দুর্দান্ত প্রকাশ। এজন্য হামবার্ট হামবার্ট ভদ্রলোকের প্রশংসা না করে পারছি না। এই কাহিনীকে হারাতে দেয়া ভীষণ অন্যায় হবে। 

 

তাই আগেই বলে নিচ্ছি এই উপন্যাস পড়তে হলে এই মনস্তাত্বিক লেখনিকে মেনে নিতেই হবে। আপত্তিগুলোকে সহজভাবে নেয়া ছাড়া এরকম শিল্পকর্মকে অনুধাবন করতে চাওয়ার কোনো মানেই হয় না। উপন্যাসটিতে বাস্তব সব অসুস্থতা, বিশ্বাসঘাতকতা, ঈর্ষা, কামনা, প্রেম-ভালোবাসার আবেগগুলো নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার থাকার কারণেই হয়ত মি. ক্লার্ক সম্পাদনার গুরু দায়িত্বটি আমার উপরেই চাপিয়ে দিয়েছেন।  মূলত, ‘ললিতা’ এমনই একটি উপন্যাস যাকে নিঃসন্দেহে একটি ‘সাইকোলজিক্যাল সার্কেল’ বা ‘মনস্তাত্বিক চক্র’ বলা যেতে পারে। কাজ হিসেবে নিখুঁত এক শিল্প, একইসাথে বিজ্ঞান ও সাহিত্যমানের বিচারে এই উপন্যাসের গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। একজন মানুষের ভিন্ন দৃষ্টি, অসুস্থ চাওয়া-পাওয়া, এক অদ্ভুত প্রেমিকার মতো ছোট্ট এক মেয়ে, একজন বিশ্বাসঘাতক স্ত্রী, ইগোসর্বস্ব এক মা কিংবা সামগ্রিকভাবে হাহাকারের মতো কুড়ে কুড়ে খাওয়া স্মৃতির এক অনবদ্য উপাখ্যান এই উপন্যাস। এখান থেকে আমরা গভীর সব বোধ অনুভব করতে পারি। শিখে নিতে পারি এক নতুন প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে উপযোগী করে তুলতে কীভাবে আমাদের সমাজ ও নিজেদের সতর্ক করা উচিত।   

 

জন রে জুনিয়র, পিএইচডি  ওয়াইডওর্থ, মাস                  

 

প্রথম খণ্ড    

 

১.  

 

ললিতা। আমার জীবন প্রদীপ, আমার কামনার আগুন। আমার আত্মা, বিশুদ্ধ এক পাপ। ল-লি-তা; যতবার উচ্চারিত হয়, মুখের উপরের তালুতে, দাঁতের গোড়ায়, জিহ্বাটি তিন-তিনবার করে আলতো ছুঁয়ে আসে। কতো সহজ সে স্পর্শ, ল-লি-তা!  

 

চার ফুট দশ ইঞ্চির মেয়েটি একপায়ের মোজা খুঁজতে খুঁজতে সাতসকালে যখন ব্যস্ত থাকত, তখন ওর নাম ছিল ‘লো’, শুধুই ‘লো’। ঘরে কখনো ‘লোলা’ বলেও ডাকা হতো, স্কুলে সবাই ডাকত ‘ডলি’ বলে। পোশাকি নাম ‘ডলরিস’, ডলরিস হেইজ। কিন্তু আমার বুকে, প্রতিটি মুহূর্তে, ও ছিল শুধুই ললিতা।  সে কি এ জন্মেই প্রথম? নাকি আগেও এসেছিল? হয়ত এসেছিল; আমাদের আগেও একবার দেখা হয়েছে। আদতে ললিতা নামের কেউ ছিল না হয়ত, যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম—সমুদ্রের ধারের সেই রাজ্যটিতে, কোনো এক গ্রীষ্মে, নিজের বয়সী এক মেয়েশিশুকে। কবে? সেও বহুকাল আগের কথা, আমার শৈশবস্মৃতির গল্প। একজন খুনির এই খামখেয়ালী বর্ণনাটিতে—আপনি নির্দ্বিধায় নির্ভর করতে পারেন।  

 

প্রিয় পাঠক, উপস্থিত জুরি বোর্ডের ভদ্রমহোদয়-মহোদয়াগণ, আপনারা আমাকে খুব সহজেই একজন খুনী বলে সাব্যস্ত করতে পারেন। তবে তার আগে, আমার এই উপাখ্যানের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিন।  

 

২.  

 

আমার জন্ম প্যারিসে, ১৯১০ সালে। আমার বাবা ছিলেন ফ্রেঞ্চ ও অস্ট্রিয়ান মিশেলে একজন সুইস নাগরিক। তাঁর রক্তে, শিরা-উপশিরায়, বইছে দানুব নদীর প্রবাহ। কিছুটা সময়ের জন্য—আমার সেই ছোটবেলার সুন্দর স্মৃতি স্মরণ করে নিচ্ছি।   

 

রিভেইরার বিলাসবহুল এক হোটেলের মালিক ছিলেন আমার বাবা। তার বাবার ছিল ওয়াইনের ব্যবসা, আর বাবার দুই পিতামহের ছিল অলঙ্কারের দোকান ও রেশমের ব্যবসা। তিরিশ বছর বয়সে জেরোমি ডান নামে এক ইংরেজ পর্বতারোহীর মেয়েকে বাবা বিয়ে করেন। বিয়ের বছর কয়েক পরেই আমার মা মারা যায়। যতদূর শুনেছি এক পিকনিকে যাবার পরে বজ্রপাতে তার মৃত্যু ঘটে। আমার বয়স তখন তিন বছর। তাই তখনকার কথা আমার মনে পড়ে না। মা ফটোজেনিক ছিল, কিন্তু ছবি তুলতে পছন্দ করত না। ফলে তার কোন ছবি আমার কাছে নেই। মা দেখতে কেমন ছিল, মনে পড়ে না। মা’র কথা ভাবলে স্মৃতির ভেতর ধূসর আলোছায়া খেলা করে শুধু, একটা অবয়ব ভেসে ওঠে, মুখটা দেখা যায় না। গভীর শূন্যতা এক জাগে, এতটুকুই।  

 

আমার মায়ের ছোটবোন সিবিল আন্টিকে বিয়ে করেছিল আমার বাবার এক চাচাত ভাই। বিয়ের কিছুদিন পর তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তারপর থেকে আন্টি আমাদের বাড়িতে থাকত। বাড়ির সব কাজ করত, আমার দেখাশোনা করত, শৈশবে তার কাছেই আমার বড় হয়ে ওঠা। কার কাছে যেন শুনেছিলাম বাবার সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আন্টির চোখগুলো ছিল ভীষণ সুন্দর। আমিও আন্টিকে পছন্দ করতাম, ভালোবাসতাম মায়ের মতোই। আন্টি কখনোই চাইতো না আমি আমার বাবার ছায়ায় বড় হই, কিংবা বাবার মতো হয়ে গড়ে উঠি। আমাকে আমার মতো হয়ে উঠতে বলত। আজ তার কারণেই আমার যতটুকু ‘আমি’ হয়ে ওঠা।  

 

সিবিল আন্টির লেখালেখির অভ্যাস ছিল, কবিতা লিখত সে। তার ভেতর আরেকটা জিনিস ছিল, ভয়াবহ রকম কুসংস্কারে বিশ্বাস। আন্টি ভাবত আমার বয়স যখন ষোল হবে তখন সে মারা যাবে। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার, আমার ষোল বছর বয়সেই আন্টি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।  আন্টিকে যে আংকেল বিয়ে করেছিলেন, উনি আমেরিকায় থাকতেন বেশিরভাগ সময়। আন্টির সাথে ডিভোর্স হবার পরে সেখানেই থেকে যান, পারফিউমের বিশাল ব্যবসা সামলান বাকিটা জীবন।  

 

আমার শৈশবের সময়টা একদমই মন্দ কাটেনি। তখনকার পড়া সেই বইয়ের ঘ্রাণগুলো, সাগরতীরের সুন্দর বালিয়াড়ি, বন্ধুসুলভ পোষা কুকুর, কমলালেবুর গাছ, বাগান, সমুদ্রের আবহাওয়া আর চারপাশের সুখী সুখী মানুষের মুখগুলো আজও মনে পড়ে। ভীষণ আনন্দে ছিলাম তখন। আমাদের যে হোটেল ছিল সেটার নাম ‘হোটেল মিরানা’। সিবিল আন্টি মারা যাবার পর বাবার সাথে ওখানেই আমার বেড়ে ওঠা। সেখানকার প্রত্যেকেই আমাকে আদর করত। কর্মচারী থেকে টুরিস্ট—সবারই পছন্দ ছিলাম। এমনকি যারা বাবাকে একদমই পছন্দ করতে পারেনি তারাও আমাকে পছন্দ করত, দামী দামী উপহার পেতাম তাদের কাছ থেকে।  

 

যদিও বাবাকে অপছন্দ করার তেমন কোনো কারণই থাকতে পারে না। মোটেও মন্দ কেউ ছিলেন না বাবা। বরং অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর। আমার চমৎকার বন্ধু, আমার মা, আমার প্রথম শিক্ষক—সব বাবাকেই জেনেছি। উনি কখনোই আমাকে মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। বাবা আমাকে সাঁতার শেখাতে নিয়ে যেতেন সুযোগ পেলেই, অবসরে ঘুরতে নিয়ে যেতেন, সাইকেল চালাতে শিখিয়েছেন। মাঝে মাঝে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম দুজন। আমার বই পড়ার অভ্যাসটাও তৈরি হয় বাবার কারণেই। সে সময় ‘ডন কিহোতে’, ‘লা মিজারেবল’ এর মতো চমৎকার কিছু বই পড়ে ফেলেছিলাম। বাবাকে আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করতাম, ভালোবাসতাম। হোটেলের কর্মচারীরা কেউ নিজেদের মধ্যে যখন বাবাকে নিয়ে কথা বলত, আমি কান খাড়া করে শুনতাম। বাবার মেয়ে বন্ধুদের গল্প, তাঁর সুন্দর ব্যক্তিত্ব, তাঁর প্রশংসা শুনতে ভালো লাগত। যাকে এতটা ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, তাঁর নামে ভালো কথা শুনতে ভালো তো লাগবেই।  শৈশবই মানুষের জীবনের সেরা সময়। যার শৈশবস্মৃতি নেই তার মতো অভাগা আর কে আছে? আমার সুন্দর শৈশবের পিছনে আমার বাবার অবদান সবচেয়ে বেশি।  

 

কয়েক মাইল দূরেই একটা ইংরেজি স্কুল ছিল। সেখানেই পড়াশুনা করি তখন। পড়াশুনাতেও ভালো ছিলাম, খেলাধুলাও করতাম নিয়মিত। অল্পদিনেই সহপাঠী, স্যার সবার সাথেই আমার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্কুলে থাকাকালীন আমি এক অদ্ভুত বিষয়ের সাথে পরিচিত হই। আমার বয়স তখন কত হবে, সেদিন সম্ভবত আমার তেরোতম জন্মদিন ছিল। এনাবেলের সাথে তখনও পরিচয় হয়নি। সেদিন স্কুলের বাগানে আমেরিকান এক ছেলেকে দেখলাম লুকিয়ে লুকিয়ে পকেট থেকে এক নগ্ন নায়িকার ছবি বের করে দেখছে। আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি, ছবিটা দেখার পরে আমার শরীর শিউরে উঠছিল। আমার কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেমন অদ্ভুত আচরণ করছিল। মানুষের শরীরও যে এক অজানা সৌন্দর্য আর রহস্য ধরে রাখতে পারে সেদিনই প্রথম অনুধাবন করি। সেই প্রথম যৌনতা সম্পর্কে জানতে পারি। তারপর অবশ্য ওই বয়সে যৌনতা সম্পর্কে যতটুকু জানা প্রয়োজন তার সবটুকুই আমি বাবার কাছ থেকে জানতে পারি। আর তার কিছুদিন পরেই হাইস্কুলে পড়াশুনার জন্য আমাকে লিয়নে পাঠিয়ে দেয়া হয়। 

 

সময়টা ছিল ১৯২৩ সাল। বাবা আমাকে লিয়নে পাঠিয়ে দিয়ে এমমি ডি আর এবং তাঁর মেয়ের সাথে ইটালি ঘুরতে চলে যান। একা লাগত খুব, কিন্তু একাকীত্বের কষ্ট ভাগ করে নেবার কেউ ছিল না আমার।     

 

৩.  

 

এনাবেলের প্রসঙ্গ যখন এল তখন ওর পরিচয়ে যাচ্ছি। এনাবেল ছিল লেখকের মতোই মিশ্র জাতীয়তার খুব মিষ্টি একটা মেয়ে। পার্থক্য এতটুকু, সে ছিল অর্ধেক ইংরেজ আর অর্ধেক ডাচ। যদিও এনাবেলের স্মৃতি আমার মধ্যে থেকে গত কয়েক বছরে অনেকটাই মুছে গেছে। অথচ ললিতার সাথে দেখা হবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এনাবেলের স্মৃতিই ছিল আমার সব। এমনকি কখনো ভাবতেও পারিনি এইভাবে এনাবেলকে আস্তে আস্তে ভুলে যাব আমি। ললিতার প্রসঙ্গে পরে আসছি, আগে এনাবেলের কথা শেষ করে নিই।  

 

মানুষের স্মৃতি দুই ধরণের। এক ধরণের আছে, খোলা চোখেই স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়, দেখা যায়, চাইলেই ছোঁয়া যায়। যেন সেই স্মৃতিগুলো বারবার স্মরণ হতেই প্রস্তুত। ভাবনার সাথে সাথেই যেন সেই স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। মাথার ভেতরে স্মৃতিগুলো পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। যেভাবে আমি এনাবেলকে দেখতে পাই। তার মধুরঙা সোনালি শরীর, চোখের লম্বা পাপড়ি, উজ্জ্বল মুখ, বাদামী ববকাট চুল, একেবারেই বাস্তব অনুভূতি। দ্বিতীয় ধরণটি হচ্ছে, যে স্মৃতি চোখ বন্ধ করে, মস্তিস্কের গভীর থেকে গভীরে ঢুকে, যেন সাধনার মাধ্যমে জাগিয়ে তুলতে হয়। এই স্মৃতিতে আমি শুধু ললিতাকেই দেখতে পাই।  

 

তার আগে কিছু ব্যাপার স্পষ্ট করে দিতে চাই, এনাবেল ছিল আমার কয়েকমাসের ছোট। যেন ভালোবাসতেই তৈরি করা হয়েছিল ওকে; সুন্দর, স্নিগ্ধ, আদুরে একটি মেয়ে। ওর বাবা-মা ছিল আমার আন্টির পুরনো বন্ধু। আমাদের হোটেলের কাছাকাছি কিছুদিনের জন্য একটা বাড়িতে ভাড়া ছিল। এনাবেলের বাবার নাম মি. লেই, টাকামাথার মধ্যবয়সী লোক। আর এনাবেলের মা মিসেস লেই ছিল হাতির মতো মোটা, বিশালদেহী। তাদেরকে আমি মোটেই পছন্দ করতাম না। এর সবচেয়ে বড় কারণ, তাদের জন্য এনাবেলের সাথে আমি ঠিকমতো মিশতে পারতাম না। এনাবেলকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখত তারা।  

 

অথচ আমি এনাবেলের সাথে দেখা করার জন্য পাগল ছিলাম। যতক্ষণ দেখা না হতো, কথা না হতো ততক্ষণ আমার দমবন্ধ লাগত। এ কথা তো আর ওর বাবা-মা বুঝবে না, তাই তাদের চোখ এড়িয়ে সব সময় এনাবেলের সাথে কথা বলার সুযোগ খুঁজতাম। সমুদ্রতীরে বসে এনাবেল একমুঠো বালি হাতে তুলে নিয়ে আঙুলগুলোর ফাঁক দিয়ে বালি ঝরঝর করে ঝরতে দিত, আর এই দৃশ্য পাশে বসে আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখতাম। বিকেলের সূর্যের আলো এসে আমাদের সময়টাকে রাঙিয়ে যেত। আমরা রঙিন সময় উপভোগ করতাম, ভালোবাসতাম একজন আরেকজনকে। আমাদের দুজনের চিন্তা ভাবনার ধরণ ছিল কিছুটা গম্ভীর প্রকৃতির। মনে হবে ইউরোপের বিশাল কোনো পণ্ডিত আমরা, যতটুকু সুযোগ পেতাম ভারিক্কি সব বিষয় নিয়ে আলাপ করতাম, পৃথিবীর জনসংখ্যা সমস্যা, টেনিস, আর সবকিছুই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমাদের প্রেম বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় এসে ঠেকত। এনাবেল বড় হয়ে নার্স হতে চেয়েছিল, আর আমি, এডভেঞ্চারপ্রিয় কোনো স্পাই।  

 

বাইরে থেকে মনে হবে আমাদের সম্পর্ক স্থির পানির মতো নীরব আর প্রশান্ত। অথচ ভেতরে ভেতরে আমাদের ভালোবাসা ছিল উন্মাদের মতো উত্তেজনাপূর্ণ। অস্থিরতা কাজ করত ভেতরে ভেতরে, দুজনের মাঝেই ছিল পরস্পরকে কাছে পাওয়ার অদম্য ব্যাকুলতা, অসংজ্ঞায়িত, তীব্র যন্ত্রণাবোধ। যতই দিন যেতে থাকে আমাদের ভালোবাসাও সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে, দুজন ছটফট করতে থাকি নিজেদের ভেতর। একে অন্যের মাঝে যেন রক্ত-মাংসে একাকার ছিলাম। তখন আমাদের বয়সী শিশুরা যতটুকু মেশার সুযোগ পেত আমরা ততটুকুও পাইনি। এমনকি পথের বা বস্তির বাচ্চারা যেরকম সুযোগ পেত অতোটুকু মেশার সুযোগও আমরা পেতাম না। তাই বলে আমাদের একেবারেই দেখা হতো না এমন নয়। আমাদের দেখা হতো, কিন্তু পুরোটা সময় বড়দের সামনে থাকতে হতো। তাদের দৃষ্টির আড়াল হবার অনুমতি ছিল না। সুতরাং একজন আরেকজনের সাথে দেখা করতে কতটা বেপরোয়া ছিলাম নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছেন। বেপরোয়া হয়ে একদিন এনাবেলদের বাগানের ভেতর চুপি চুপি দেখা করেই ফেললাম।  

 

দিন যায়। সমুদ্রতীরের নরম বালিতে আমাদের দুইজোড়া পায়ের ছাপ বড় হতে থাকে। এর মাঝে যতটুকু সুযোগ পেতাম, সবার চোখ এড়িয়ে আমরা পরস্পর পরস্পরকে ছুঁয়ে দিতাম। বালির ভেতরে অর্ধেক হাত ডুবিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের হাতগুলো কাছাকাছি হতো। ছোঁয়ার তাগিদে আরো কাছে এসে শুধু হাতের ছোঁয়াতেই যেন রক্তে-মাংসে একাকার হয়ে যেতাম, ওই বয়সে এইটুকুই ছিল বিশাল পাওয়া। আমরা দুজন দুজনকে ছুঁয়ে দেবার অবাধ্য ইচ্ছা নিয়েই বেঁচে ছিলাম সেই সব দিন। মাঝে মাঝে বাচ্চাদের তৈরি বালির ঘরগুলো বেশ ভালো আড়াল হয়ে উঠত। সুযোগ বুঝে আমরাও একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে দিতাম, দুজনের লবণাক্ত ঠোঁট। কত কথা যে সেই মুহূর্তগুলোতে মিশে আছে। কিছুই বলা হতো না। বলতে না পারার যন্ত্রণা মেখে ঠোঁটের ছোঁয়ায় আরো ব্যাকুল হয়ে যেতাম।  

 

তবু মনে হতো কী যেন রহস্য বাকি রয়ে গেল! পাখিদের মতো হৃদয় নিয়ে দু’টো কিশোর কিশোরী সেই রহস্যের কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পেত না। ফলে রাগ হতো, শরীরের প্রতিটি কণায় ক্ষোভ বেড়ে যেত। অলৌকিক কারো প্রতি সেই রাগ, ক্ষোভ, অভিমান বেড়ে চলত। আমরা ক্ষোভটুকু মুছে দিতে একজন আরেকজনকে নখ দিয়ে আঁচড়ে দিতাম। ভাবতাম এবার বুঝি আমাদের ভালোবাসার যন্ত্রণা মুছবে, এবার বুঝি দেহের ক্লান্তিগুলো মিটে যাবে শেষমেশ। কিন্তু আমাদের যন্ত্রণা কমত না। বরং সেই রাগ, অভিমান অজানা সেই রহস্যের প্রতি আকর্ষণ প্রতিমুহূর্তে শুধু বেড়েই চলত।  গত কয়েক বছরে যত্ন করে রাখা প্রিয় জিনিসগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। তারমধ্যে একটা ছবি ছিল। সমুদ্রের ধারে একটা সাইডওয়াক ক্যাফেতে আমার সিবিল আন্টি তুলে দিয়েছিল ছবিটা। ছবিতে এনাবেল ছিল, সাথে এনাবেলের বাবা-মা, ড. কুপার, আমি এবং আরো কয়েকজন ভদ্রলোক, সবাই সিরিয়াস ভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বুঝি না, মানুষ তখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে এমন ভাব নিয়ে কেন দাঁড়াত! যেন এইমাত্র কোনো যুদ্ধ শেষ হলো বা রাজনৈতিক সংলাপ শেষ করে এসে ক্যামেরার সামনে বেচারাদের দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছে। ছবিটা যেমনই হোক, আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেটাই আমার কাছে এনাবেলার একমাত্র ছবি। আন্টির এলবাম নাড়তে নাড়তে তখন কিভাবে যে লুকিয়ে ফেলেছিলাম ছবিটা, সেই হৃদয় ঢিবঢিব করা বেপরোয়া কিশোরকে অনুভব করতে গিয়ে আজ নিজেই অবাক হয়ে যাই। মজার ব্যাপার হলো, সেই ছবিতে এনাবেলা পুরোপুরি আসেনি, ওর শরীরের বেশিরভাগ অংশই ছবির বাইরে। এনাবেলের শুকনো কাঁধ আর বাদামী চুলগুলো দেখে চিনে নিতে হয়েছে। আর ছবিটাতে আমার থাকার ব্যাপারটা পুরোপুরি নাটকীয়।   

 

যারা ছবি তুলতে দাঁড়িয়ে ছিল আমি তাদের কারো সাথেই দাঁড়ানো ছিলাম না।  পেছনে একটু দূরে একা বসে ছিলাম। ছবি ওয়াশ করে আনার পর দেখি আমি ফ্রেমবন্দি হয়ে গেছি। মনে হবে, মন খারাপ ভাব নিয়ে একটা কিশোর ছেলে গায়ে কালো রঙের জার্সি, সাদা প্যান্ট, পায়ের উপর পা তুলে প্রচণ্ড অভিমানে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। ওই ছবিটা অবিস্মরণীয় সেই গ্রীষ্মের শেষদিন তোলা হয়েছিল। এনাবেলের সাথে সেদিন ছিল দেখা করার শেষ সুযোগ। পরদিনই ওরা চলে যাবে। একটা দুর্বল অজুহাত দেখিয়ে আমরা ক্যাফে থেকে সরে সৈকতের দিকে চলে গিয়েছিলাম। কেননা, ভালো সব অজুহাত ততদিনে ফুরিয়ে গেছে।  আমরা জনমানবহীন অন্ধকার সৈকতে এসে অবাক হলাম। চারিদিক সুনসান নির্জনতা, কাকপক্ষীটিও নেই, শুধু বালির উপরে অসংখ্য পায়ের ছাপ আর বড় বড় লালচে পাথরগুলো থেকে ঝাপসা বেগুনি আলো ঠিকরে বের হচ্ছিল। কেউ কি তখন আমাদের দেখছিল? বালির উপর একটা সানগ্লাস পড়ে ছিল। কেউ ভুল করে ফেলে গেছে। সেই ফেলে যাওয়া একা সানগ্লাস সাক্ষী ছিল শুধু। হৃদয়ের সমস্ত কথা জানাতে আমি ভালোবাসার মানুষটির সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ি। একটা হাত আলতো বাড়িয়ে দিই ওর দিকে। ঠিক তখনই মনে হচ্ছিল হেমিংওয়ের সমুদ্রের সেই বিখ্যাত জাহাজী প্রচণ্ড চিৎকার জুড়ে দিয়ে আনন্দ উল্লাসে অশ্রাব্য খিস্তি করে আমার ভেতরে তুমুল উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছিল। 

 

সেই মুহূর্তের ঠিক চারমাস পরেই একদিন এনাবেলা প্রচন্ড জ্বরে ভুগে মারা যায়।  

 

চলবে...

Topics: ললিতা অনুবাদ ভ্লাদিমির নবোকভ রনক জামান

মূল : ললিতা by ভ্লাদিমির নবোকভ অনুবাদ : রনক জামান (১ম কিস্তি)

Login to comment login

Latest Jobs