পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতি: কোথায় আছি আমরা?

Education 19

গো লা ম ফা রু ক হা মি ম

পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতি: কোথায় আছি আমরা?

..................................................................................

মানুষ অবিশ্বাসে পাই না রে সে মানুষনিধি

এই মানুষে মিলতো মানুষ চিনতাম যদি

- ফকির লালন সাঁই (১৭৭৪-১৮৯০)

পারিবারিক শিক্ষা-অর্থাৎ পরিবার থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ব্যক্তির মানস গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এ শিক্ষা হতে পারে নৈতিকতা, মূল্যবোধ বা নানামুখী জীবন-দক্ষতা প্রসূত। ব্রার্টান্ড রাসেল তার আত্মজীবনীতে বলেছিলেন, (১৯২১ সালে) আমার প্রথম সন্তান যখন জন্ম নিয়েছিল, তখন মনে হচ্ছিল আমার ভেতরের সব অবদমিত রাগ-ক্ষোভ (pent-up emotion) যেন উধাও হয়ে গেছে; এবং পরবর্তী দশ বছর একজন বাবা যা করে থাকেন আমার মূল কাজগুলো ছিল তা।’

রাসেলের বয়স তখন পঞ্চাশ- সে সময় তিনি নিজ সন্তানের লালন পালন ও শিক্ষায় নিজেকে বিস্ময়করভাবে নিয়োজিত রাখেন। ব্রার্টান্ড রাসেল এর এ উদাহরণটি আনা হলো, তিনি জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন শুধু সেইজন্যই নয়। তিনি ছিলেন পুরুষ এবং প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় শিশুযত্নের ক্ষেত্রে আমরা পুরুষ নয়, নারীর ভূমিকাকেই প্রধান করে দেখতে অভ্যস্ত। তবে এ আলোচনার বিষয় অন্য। রাসেল শিশুপালনকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। কারণ তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন শিশু মূলত: তার পরিবার থেকে যা শেখে তা তাকে ভবিষ্যতে পথ চলতে শেখায়। এক্ষেত্রে তার ব্যক্তিত্ব, আচার আচরণে বাবা কিংবা মায়ের প্রভাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাতো রয়েছেই।

উনিশ শতকে বাংলাদেশে সামাজিক জাগরণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। বিশেষত: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন বাঙালী শিশুর ‘নীতিশিক্ষার আদিগুরু’। শৈশবে বিদ্যাসাগরের বাল্যশিক্ষা পাঠ করেন নি আমাদের পিতা/মাতামহের এমন কেউ নেই। উনিশ শতকে বাংলা দেশে ঘরে ঘরে পঠিত হতো বাল্যশিক্ষা যা বাঙালির চারিত্র ও মানসগঠনে সে আমলে রেখেছিল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। এখানে বাংলা দেশ বলতে বোঝানো হচ্ছে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে।

‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’ কবি গোলাম মোস্তফার এ কবিতাটি আমরা জানি। বলাবাহুল্য, এখানে অবশ্য শুধু শিশুর পিতাই নয়, শিশুর মাতাও প্রতিটি শিশুর অন্তরে একই মর্যাদায় বিরাজ করছেন। এ শিশুই পরবর্তীতে তৈরি করছে সমাজ, এবং সমাজ তার রাজনৈতিক অভীক্ষা নিয়ে তৈরি করছে রাষ্ট্র। সামাজিক পরিবর্তনে, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে পরিবারের এ শিশুই বড় হয়ে রাখছে অবদান। তাহলে মোদ্দা কথা দাঁড়াচ্ছে কি ?

অবশ্যই তা’ শিশুর পরিবার, বাবা,মা ও তার পরিবারকে ঘিরে চারপাশের পরিবেশ। এ পরিবেশ শুধুমাত্র ভৌত পরিবেশ নয়, একই সাথে সাংস্কৃতিক ও মানসিক পরিবেশও- যার মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিশু বেড়ে ওঠে, এবং পরবর্তীতে একসময় সামাজিক পুর্নগঠনে (social reconstruction) রাখতে পারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

গত তিনশ বছরে বাংলাদেশের সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখতে পাব সময় কখনো একইভাবে প্রবাহমান ছিল না। একেক সময়ে একেক জাগরণের ফলে সমাজের গতিশীলতা (dynamics) ঋদ্ধ হয়েছে নানাভাবে। তবে বাংলায় এ জাগরণ,যাকে অনেকে আদুরে গলায় বাঙালির রেনেসাঁ বলেও অভিহিত করে থাকেন তার উন্মেষ অনেকের মতে উনিশ শতকে। এসময়ে ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব, নানা ধরণের ধর্মীয় সংস্কার, সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালি মানস পরিণত হওয়া শুরু করে।

ডিরোজিওর নব্য-বঙ্গ আন্দোলন, যুক্তিবাদ ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালি পরিবার ও সামাজিক জীবন নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে ওঠে। বাঙ্গালি তার যুক্তি, বুদ্ধি ও দেশপ্রেমের মূল্যবোধে উদ্ভাসিত হতে থাকে। রাজা রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অক্ষয় কুমার দত্ত প্রমুখ তাদের নিজ নিজ র্কীতি ও সামাজিক সংযোগের মাধ্যমে এক্ষেত্রে পালন করেন সুদূরপ্রসারি ভূমিকা।

পরবর্তীতে দেশভাগ ও দেশভাগ পরবর্তী সময়ে ইতিহাসের নানা ক্রান্তির ফলে দ্বিখন্ডিত বাঙালি সমাজ নতুনভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিনির্মাণে কাজ শুরু করে। তবে অচিরেই পূর্ববাংলার বাঙালি সমাজ এক নির্যাতন ও শোষণমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পতিত হলে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আজকের বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটে, সে ইতিহাস আমরা সবাই জানি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এ দেশের আপাময় জনগণ- ধর্ম, গোত্র, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলকে একটি অভিন্ন ও সর্বব্যাপী মূল্যবোধ প্রদান করেছিল। এ মূল্যবোধ ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতান্ত্রিক চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও দ্রুত একটি আদর্শিক অবস্থানে নিজেকে নিয়ে যায় যা তার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চেতনাকে প্রগতিশীল ও শুভবোধ সম্পন্ন করে তুলতে অনেকাংশে প্রভাবিত করে। তবে সে অবস্থাও খুব বেশিদিন টেকেনি।

বাঙ্গালি বা বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসে গোটা উনিশ শতককে যদি ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের শতক বলে অভিহিত করা যায়, তবে বিশশতককে বলা যেতে পারে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শতক। এ সময়কালে দেশপ্রেম, মাতৃভাষা, স্বদেশের সংস্কৃতির লালন ও সংরক্ষণের দিকে ঝুকে পড়ে সকল স্তরের মানুষ। একদিকে দারিদ্র অপরদিকে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রাবল্য ও আবেগ। এর সবই ছিল খুবই ইতিবাচক এবং বিশেষত: যুব সমাজের চরিত্র গঠনের জন বিশেষ সহায়ক।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এসে ধর্মীয় কূপমন্ডুকতা যেন এ অঞ্চলে আবারো মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। মানুষের জাগতিক চিন্তা তার মানবিক ও সুকুমারবোধকে অর্ধগৃধ্নু মানসিকতায় রপান্তরিত করেছে। ফলে সমাজে পরিলক্ষিত হচ্ছে অবক্ষয় ও বিমানবিকায়নের (dehumanization) নানা চিত্র।

আবারো একটু পেছনে ফিরি। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ একদিকে মোকাবেলা করেছিল একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুর্নগঠনের চাপ, অপরদিকে খাদ্যাভাবসহ মৌলিক চাহিদা পূরণের সীমিত সামর্থ্য। কিন্তু ১৯৭৫ সালের দু:খজনক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতি ও সাংবিধানিক মূল্যবোধকে আবারো ঠেলে দেয় ঝুঁকির মধ্যে। ফলে সমাজ আরেকধরণের দুর্দশার মধ্যে সেসময় নিপতিত হয়। এ দুর্দশা শেকড়বিচ্ছিন্নতার। হীনবল, কৃত্রিম আত্মপরিচয়ের সংকটের। সে আরেক আলোচনা।

তবে সে অবস্থা বর্তমানে তিরোহিত হলেও এদেশের সমাজে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ যেন সর্বকালের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নগামী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। উপরিকাঠামো সুদৃশ্য ও আপাত: চকচকে হলেও যে খুঁটির ওপর এ কাঠামো দাঁড়িয়ে রয়েছে তা অনেকাংশে নড়বড়ে হয়ে গেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ধর্মীয় ও সামাজিক অসহিষ্ণুতা। ক্রমবর্ধমান নারী ও শিশু নিগ্রহের হার দেশের সচেতন ও বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত, ক্ষুদ্ধ ও বিচলিত করে তুলেছে। মানুষের আর্থিক অসততা ও দুষ্কৃতি পুরস্কৃত না হলেও তিরস্কৃত হচ্ছে কালেভদ্রে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদ অসৎব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করছে সমাজের নায়ক হিসেবে।

সামাজিক অবক্ষয়ের এ সময়ে পরিবারের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। যারা নানা অপরাধ বর্তমানে সংঘটন করছে এদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা কম নয়। একসময় মনে করা হতো দারিদ্র মানুষকে অধিকাংশ সময় বিপথে চালিত করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, স্বচ্ছল ও ধনী পরিবারের সন্তানরা জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদ নামের আসুরিক কর্মকান্ডে যাকে ইংরেজীতে বলা হচ্ছে radicalization; যার প্রভাবে উচ্চশিক্ষিত পরিবারের প্রযুক্তিমনস্ক তরুণরা ধর্মীয় বিভ্রান্তির কবলে পড়ে নিরীহ মানুষ হত্যার উন্মাদনায় মেতে উঠছে। বলাবাহুল্য, আড়াল থেকে এসব মেধাবী তরুণদের ব্যবহার করছে রাজনৈতিক ক্ষমতালিপ্সু কিছু মেফিস্টোফেলিস।

এটি যদিও একটি বৈশ্বিক সমস্যা কিন্তু ইতোমধ্যে এর বিষবাষ্প আমাদের দেশেও এসে পৌছেছে। রাষ্ট্র এ সমস্যার রাজনৈতিক প্রতিরোধে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, একই মাত্রায় এর সামাজিক প্রতিরোধ দৃশ্যমান হচ্ছে না। এজন্য আমাদেরকে আমাদের মতই এর একটি সমাধান বের করে নিতে হবে বিপথগামী ও ভ্রান্ত মতাদর্শে বিশ্বাসী এসব তরুণকে যাতে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা যায়। পরমতে বি্শ্বাসী, সহনশীল, ভিন্নতা গ্রহণের মানসিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন মানুষের বড় অভাব যে এখন সর্বত্রই বড় বেশি অনুভূত হচ্ছে।

আমরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তির ব্যবহার, পোষাক আশাকে যতই আধুনিক হয়ে উঠছি, মনুষত্ব্যে, চিন্তায় ও বোধে ততই যেন হয়ে উঠছি অনগ্রসর। রাণী রাসমনি, রানী ভবানী, শেরে বাংলা ফজলুল হক, হাজী মোহাম্মদ মহসিন, খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা সে যুগের মানুষ। এ যুগে এ মাপের মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বললে ভুল হবে, আসলে তৈরিই হচ্ছে না। মরমীবাদ, সুফিবাদ এর এদেশে, শাহ আব্দুল করিম, হাছন রাজার এদেশে ঔদার্য প্রদর্শন, সহনশীল আচরণ, ধৈর্য তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হারিয়েছে। এ অবস্থায় করণীয় কি? এসব ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা কতটুকু ? রাষ্ট্র যেখানে ব্যর্থ হচ্ছে, পরিবার এ অবস্থা সামাল দিবে কিভাবে? কতটুকু ক্ষমতা তার রয়েছে?

প্লেটো ও এরিস্টটল মানুষের জীবনে পরিবারের ভূমিকা কী তা নিয়ে এক অম্লমধুর বিষয়ের অবতারণা করেন আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে। যার প্রাসঙ্গিকতা এখনো বিস্ময়ের উদ্রেক করে। প্লেটো সমাজের মঙ্গলের জন্য পরিবার ব্যবস্থা তুলে দেয়ার পক্ষে ছিলেন। মানুষ রাষ্ট্রের কাছে তার পূর্ণ আনুগত্য (allegiance) সর্মপণ করবে এবং শিশু তার মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বে গড়ে উঠবে। বিকশিত হবে। এ ছিল প্লেটোর চিন্তা।

শিষ্য এরিস্টটল গুরুর এ বক্তব্য মেনে নিতে পারেননি। তিনি দ্বিমত পোষণ করে বলেন,”families were the fundamental social unit of society because they have a transformative effect on individuals and on the larger body politic.”

তিনি আরো বলেন যে মানুষের ভেতরে অপরের জন্য শ্রদ্ধা ও ভালবাসা সবচেয়ে কার্যকরভাবে বিকশিত ও তৈরি হয় পারিবারিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। এটিই একটি পরিবারের transformative effect যা মানুষকে বদলে দেওয়ার সমূহ ক্ষমতা রাখে। যেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেকটাই গৌণ, অনেকটা পাশের বাড়ির অভিভাবকের মতো।

আমরা সাধারণ মানুষ, দুই বিখ্যাত গুরু-শিষ্যের এ বিতর্কের মাঝে নাইবা গেলাম। তবে পরিবার নিয়ে প্লেটোর ভাবনা অনেকটাই ছিল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। পরিবারকে গুরুত্ব কম দিতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রকে খুশি করেছেন কিন্তু এরিষ্টটল পরিবারকে নিয়ে এসেছেন কেন্দ্রবিন্দুতে। পরিবারের গুরুত্ব প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। তবে বিষয়টি হলো, উপরিকাঠামোভুক্ত এ উন্নয়নের ডামাডোলে পরিবার, পারিবারিক মূল্যবোধ ইত্যাদি কথাগুলো যেন কেমন অপাংক্তেয় ঠেকে। তার অবস্থা যেন গ্রাম থেকে সদ্য শহরে আসা এক লাজুক কিশোরী।

শ্রীলংকার ধর্মীয় উপসনালয়ে প্রার্থনারত নিরীহ মানুষগুলোর ওপর বোমা নিক্ষেপকারীরা ছিল স্বচ্ছল ও ধনী পরিবার থেকে আগত। বাংলাদেশে হোলি আর্টিজান রেস্তোরার ঘটনায়ও সম্পৃক্ত ছিল উচ্চশিক্ষিত ধনাঢ্য পরিবার থেকে আসা সন্তানরাও। রাষ্ট্র তাদেরকে সন্ত্রাসী হতে বলেনি। তার পরিবারও নিশ্চিত তাদেরকে বোমারু হতে উদ্ধুদ্ধ করেনি। কিন্তু এখানে রাষ্ট্রের যতটা না দায় তার থেকে অনেক বেশি দায় ছিল তাদের পরিবারের। এতো প্লেটোর রাষ্ট্র নয় বরং অনেক বেশি এরিস্টটলের পরিবার। কারণ এ সন্ত্রাসীরা ছিল পরিবারের ছায়ায় বড় হয়ে ওঠা মানুষ।

বাংলাদেশের জাতীয় যুব উন্নয়ন নীতি (২০১৭) এর মূল ভিশনেই পরিস্কার বলা আছে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গৌরব বৃদ্ধিতে সক্ষম, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন আধুনিক জীবনমনস্ক যুবসমাজ” এর প্রয়োজনীয়তার কথা। এই নীতিমালার ৩৮ ধারায় যুব সমাজকে উগ্রতা পরিহার করে, উদার, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও বৈশি^ক চেতনাসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জোর দেয়া হয়েছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্র নীতিমালা প্রণয়নে মোটেও পিছিয়ে নেই। শুধু পিছিয়ে গেছে এর প্রয়োগে ও বাস্তবায়নে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবারের কাছে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার খবর পৌঁছানোর দায়িত্বও রাষ্ট্রের। তবে আশার কথা প্রতিটি পরিবার বংশ-পরস্পরায় কিছু পারিবারিক মূল্যবোধ লালন করে থাকে যার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অন্তনির্হিত মূল্যবোধ বা আদর্শের সাথেও মিল রয়েছে যথেষ্ট। যদিও দারিদ্রপীড়িত বা সামাজিক অবক্ষয়ে হতাশ অনেক পরিবার এখনো এ মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরার এক অক্ষম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

২০১৭ সালে এডুকেশন ওয়াচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে বিশেষত: দেশের বিদ্যালয়সমূহে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল। জরিপে দেখা গেছে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পক্ষে হাত তুলেছেন। কিন্তু উদ্বেগের ব্যাপার হলো প্রায় এক তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা হয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রশ্নে একমত পোষন করেননি অথবা নিরপেক্ষ থেকেছেন। এদের মধ্যে মা, বাবা, শিক্ষকরাও রয়েছেন। অর্থাৎ বর্তমান সমাজে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ লালন ও চর্চার ব্যাপারে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষেরই দ্বিধা রয়েছে যে এগুলো যথেষ্ট বাস্তবানুগ নয়। বিষয়টি কল্পনা করুন, কোথায় আছি আমরা।

পথভ্রষ্ট তরুণদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে এবং তাদেরকে চারদিকের প্রলুদ্ধকর নানা কিছুর হাতছানির থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে পারে তার জন্যে নিতে হবে উদ্যোগ। এ উদ্যোগ গ্রহণে সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকেই। পরিবারে বাবা মা এ ক্ষেত্রে হবেন অগ্রগণ্য। আজকের শিশু যেহেতু পারিবারিক বলয়ে গড়ে ওঠে, পরিবার তাই হতে পারে একটি সুস্থ, সুন্দর, সামাজিক পরিবেশ নির্মাণের মূল প্ল্যাটফর্ম। পরিবার থেকে যাতে মানুষ অপরের জন্য, সমাজের প্রতি দায়বব্ধতা শিখে নিতে পারে তা নিয়ে কাজ করতে হবে।

শুধুমাত্র বিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, শিক্ষক বা রাষ্ট্রীয় সংস্থাই নয়, নৈতিকতা ও সার্বিক পরার্থপরতা শিক্ষার জন্য প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে পরিবার প্রধানকে, পরিবারের সদস্যদেরকে। সেক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি অবধারিতভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, তা হলো পরিবারকে শিক্ষা দিবে কে?

সেটির উত্তরও আমরা জানি, রাষ্ট্র। রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রের সকল মানুষের জন্য এমন একটি সর্বজনীন শিক্ষার ব্যবস্থা করবে যার বজ্রআঁটুনি প্রতিটি নাগরিকের মননে, চিন্তায় ও কর্মে নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার আগুন প্রোজ্জ্বল করে তুলবে। একই সাথে আন্তরিক হলে, সক্রিয় হলে প্রতিটি পরিবার হয়ে উঠবে সামাজিক শিক্ষা ও সম্প্রীতির একেকটি আঁতুর ঘর। সেখানে সবাই শিক্ষক, সবাই ছাত্র, সবাই কর্মী।

নদী বিধৌত, পলিমাটির দেশ আমাদের। বৃষ্টিস্নাত, রৌদ্রকরোজ্জল, সবুজ, সুফলা অসম্ভব সুন্দর এদেশটি কোনভাবেই ভ্রান্তি ও দুর্বৃত্তায়নের চক্রে ঘুরপাক খেতে পারে না। এর জন্য সবার পাশে, কার্যকরভাবে দাঁড়াতে হবে রাষ্ট্রকেও। যাতে পরিবারগুলো কখনোই নৈয়ায়িক চিন্তা ও অনুশীলন থেকে বিচ্যুত না হয়।

[সাক্ষরতা বুলেটিন, নববর্ষ সংখ্যা বৈশাখ ১৪২৬, ২৯৯ তম সংখ্যা, গণসাক্ষরতা অভিযান]

Topics:

পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতি: কোথায় আছি আমরা?

Login to comment login

Latest Jobs