Posted By

সর্প-দংশনে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো দেখুন।

Fashion 31

মানুষ, সাপ ও প্রকৃতি এত নিবিড়ভাবে জড়িত যে, স্বাভাবিক নিয়মে নেহায়েৎ প্রাকৃতিক দূর্ঘটনা হিসেবে মানুষ সর্প-দংশনের শিকার হয়। সর্প-দংশন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্তৃক ২০০৯ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে ক্রান্ত্রীয় অবহেলিত রোগের মধ্যে সর্প-দংশন অন্যতম। পৃথিবীতে বিষক্রিয়াজনিত  সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয় সাপের দংশনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এর পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে ৫০ লক্ষ মানুষ সর্প-দংশনের শিকার হয়, যার মধ্যে ১,২৫,০০০ (এক লক্ষ পঁচিশ হাজার)-এর বেশী মানুষ মারা যায় এবং ২,৫০,০০০ (দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত একটি গবেষণা জরিপের ফলাফলে (অক্টোবর, ২০১০) দেখা যায় যে, বাংলাদেশে প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ প্রতি বছর সর্প-দংশনের শিকার হয়, তার মধ্যে ৬,০০০ (ছয় হাজার) মারা যায়।  বিষধর কিংবা অবিষধর যে কোন প্রজাতির সাপ মানুষসহ যে কোন প্রাণীকে দংশন করতে পারে। প্রত্যেক মশার কামড়ে যেমন ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গি হয় না, ঠিক তেমনি সর্প-দংশন করলেই মানুষ মারা যাবে এটা সঠিক নয়। সর্প-দংশনের ৭০% হ’লো অবিষধর সাপের দংশন। সুতরাং এতে (অবিষধর সাপের দংশনে) কোন বিষক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অধিকাংশ মানুষের ধারণা যে, কেবল বিষধর সাপই মানুষকে দংশন করে। তাই সাপ দংশন করলেই মানুষ মনে করে যে, তাকে বিষধর সাপে-দংশন করেছে। এ ভয়েই হৃদপিন্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে (হার্টফেল) মানুষ মারা যেতে পারে।  সাধারণত বিষধর সাপের-দংশন স্থানে দু’টি বিষ দাঁতের চিহ্ন দেখা যায়। কিন্তু অবিষধর সাপের-দংশন স্থানে দুই সারি দাঁতের (করাতের মত) চিহ্ন থাকে। তবে বিষধর কেউটে  সাপের দাঁত খুবই ছোট ও চিকন বিধায় দংশিত স্থানে দাঁতের চিহ্ন থাকে না বা বুঝা যায় না। সাপের-দংশন বা কামড়ের চিহ্ন দেখে বিষধর বা অবিষধর সাপ সনাক্ত করা কঠিন। কারণ কখনও কখনও বিষধর সাপের একটি দাঁত বসে রক্ত বের হয়। অনেক সময় বিষধর গোখরা বা কেউটে দংশন করলেও বিষ প্রয়োগ করতে পারে না, ফলে কোন বিষক্রিয়া হয় না বিধায় তাকে শুস্ক দংশন  বলা হয়। অনেকে সর্প-দংশনের সঙ্গে সঙ্গে দংশিত স্থান কেটে বা টিপে রক্ত বের করে দেয় বলে অনেক সময় মারাত্মক বিষক্রিয়া হয় না। আবার বিষধর সর্প-দংশনে বিষ প্রয়োগ করলেও যদি সেই বিষের মাত্রা পরিমিত  না হয়,তাহলেও রোগীর উপর তেমন মারাত্মক  বিষক্রিয়া হয় না। ফলে মানুষ মারা যায় না।  বিষধর সর্প-দংশনের বিষক্রিয়ায় মানুষ মারা যাওয়া ছাড়াও সর্প-দংশনে সাধারণত মানুষ তিনভাবে মারা যেতে পারে। প্রথমত সাপ দেখে বা সর্প-দংশনের ভয়ে চিৎকার দিয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত সাপ বিষধর না হলেও এদের দাঁত ও মুখ গহ্বরে নানা ধরনের মারাত্বক জীবাণু থাকে যা থেকে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে ধনুস্টংকারে রোগী মৃত্যুবরণ করতে পারে। তৃতীয়ত অনেক সাপই বিষধর নয় কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে অবিষধর সাপের কামড়েও এলার্জিক প্রতিক্রিয়াও মানুষ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

সর্প-দংশনে মৃত্যুর প্রধান কারণ: 

১. সাপ সম্পর্কে মানুুষের অজ্ঞতা ও অসচেনতা।

২. সর্প-দংশনের প্রাথমিক ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানা। 

৩. সর্প-দংশনে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীরা প্রাথমিক এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পায় না বিধায় মারা যায়।  

৪. বর্ষাকালে সাধারণত সর্প-দংশনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৬ হাজার মানুষ সর্প-দংশনে মারা যায়। অথচ অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের দেশের চেয়ে অনেক বেশি প্রজাতির বিষধর সাপ থাকলেও বছরে মৃত্যুর হার মাত্র ২- ৩ জন। বাংলাদেশে সর্প-দংশনের পর রোগীরা (৮৬%) ওঝার কাছে চিকিৎসা নে’য়ার প্রবণতা খুব বেশি। ফলে তারা মূল্যবান সময় নষ্ট করে অনেক দেরিতে মুমূর্ষু বা মরণাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছায়। 

৫. অধিকাংশ মানুষই সর্প-দংশনের প্রতিকার বা প্রতিরোধ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। 

৬. সর্প-দংশন সাধারণত রাতের বেলায় বেশি হয় বিধায় গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে এবং সময়মত হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হয় না। 

৭. বাংলাদেশে হাতে গোনা কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতালে সর্প-দংশনের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা করা হয়।  

৮. বাংলাদেশের কোথায় এবং কোন কোন সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে এন্টিভেনমের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয় তা অধিকাংশ মানুষই জানে না।  

৯. সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে চাহিদার তুলনায় এন্টিভেনমের সরবরাহ কম হওয়ায় এবং অনেক সরকারি হাসপাতাল এন্টিভেনম সরবরাহের জন্য ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় ঔষধ ভান্ডারে চাহিদাপত্রও পাঠায় না। 

১০.  বাংলাদেশে কয়েকটি বিভাগীয় এবং জেলা শহরের নির্দিষ্ট কয়েকটি ফার্মেসিতে এন্টিভেনম পাওয়া যায়। 

১১. সর্প-দংশন চিকিৎসার প্রধান অন্তরায় হ’লো এন্টিভেনম-এর অপ্রতুল্য সরবরাহ এবং উচ্চ বাজার মূল্য। বাংলাদেশে বর্তমানে একটি মাত্র ঔষধ কোম্পানি ভারত থেকে এন্টিভেনম আমদানি করে তা প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করছে। এক ডোজ এন্টিভেনম (১০ ভায়াল, ১০০ মিলিগ্রাম) এর বাজার মূল্য ১০-১২ হাজার টাকা। 

১২.  বাংলাদেশের কোন বেসরকারি হাসপাতালে সর্প-দংশনের চিকিৎসা করা হয় না। 

১৩.  সর্প-দংশন চিকিৎসায় ডাক্তার এবং নার্সদের প্রশিক্ষণের অভাব। 

১৪.  সর্বোপরি বাংলাদেশে অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে সর্প-দংশন চিকিৎসায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও নার্সের অভাব রয়েছে। 

Topics:

সর্প-দংশনে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো দেখুন।

Login to comment login

Latest Jobs