বিশুদ্ধ পানির সংকট

Health 28

 

কথায় আছে পানির অপর নাম জীবন। পৃথিবীর সকল প্রাণেরই উৎস পানি এবং সকলেই পানির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে অসংখ্য মৃত্যুর কারণও পানি। পানি যেমন মানুষকে জীবন দেয় তেমনি পানিবাহি নানা জীবাণুর মাধ্যমে পানিই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশুদ্ধ পানির অভাবে সাধারণত দেখা যায় শিশু, প্রবীণ ও গর্ভবতী নারীরাই বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকে। সুপেয় পানির সংকট নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয় আজ সমগ্র পৃথিবী উদ্বিগ্ন। পৃথিবীর চারদিকে পানি বাড়লেও সুপেয় পানির সংকট আজ বিশ্বব্যাপি। বিশ্বব্যাপি এ সংকটের পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুটো কারণই দায়ী। জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, জলোচ্ছাস, সুনামি, ভুমিকম্প, পাহাড়ধসসহ নানারকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন দায়ী তেমনি মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দুর্যোগ আরো বেশী দায়ী। কারণ প্রকৃতির প্রতি মানুষের অপরিণামদর্শী আচরণের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সংগঠিত হয়। সুপেয় পানির সবচেয়ে সহজ এবং বড় উৎস নদীর উপর মানুষ আজ দেশে দেশে বাঁধ দিচ্ছে, পাহাড় ধ্বংস করছে, নির্বিচারে পানি দুষণ করছে, যত্রতত্র খনন ও অবকাঠামো নির্মাণ করে ভু-অভ্যন্তরের পানি চলাচল বিঘিœত করছে। বর্তমান চিšাÍবিদদের অনেকেই ধারণা করছেন আগামিতে সুপেয় পানির সংকট দাঁড়াবে আরো ভয়াবহ। এমনকি অনেকেই ধারণা করছেন আগামিতে যদি কোন বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয় তবে তার মুল কারণগুলোর মধ্যে থাকবে সুপেয় পানি। আমরা জানি বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পানি নিয়ে চলছে ¯œায়ুযুদ্ধ। বিভিন্ন দেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অভিন্ন নদীর অবাধ জলপ্রবাহ নিয়ে নানা দেশের মধ্য চলছে পানিযুদ্ধ এবং এটি একটি আর্ন্তজাতিক সমস্যা। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর ৫৪টি এসেছে ভারতের মধ্যে দিয়ে, তিনটি এসেছে মায়ানমার থেকে। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসাবে নদীসমূহের জলের ন্যায্য হিস্যার দাবিদার। অভিন্ন ৫৪ টি নদীর মধ্যে ৪৭টি নদীর গতিপথে ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। এতে করে প্রবাহ কমে শুকনো মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সাগরের পানি ঢুকে ভাটি অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়াচ্ছে আবার বার্ষাকালে বন্যার তোড়ে এতদাঞ্চলের পানিয়জলের স্থানীয় উৎসগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা জানি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্রের জলস্তর দিনদিন বাড়ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রবাহিত বড় বড় নদীর উজান অংশ ভারতে বাঁধ নিমার্ণ করায় ভু-পৃষ্টে মিস্টি পানির প্রবাহও পাল্লা দিয়ে কমে যাচ্ছে। এধরণের বিভিন্ন কারণে এসব জনবসতিতে দিনদিন লবণাক্ততা যেমন বাড়ছে তেমনি ভুগর্ভস্থ জলধারায়ও তার প্রভাব পড়ছে। মোটকথা বাংলাদেশে পানিয়জলের পরিস্থিতি দিনদিন ভয়াবহ অবস্থায় যাচ্ছে। এধরণের সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় নদীর অববাহিকায় ভাটি অঞ্চলের দেশগুলোতে একই রকমের সমস্যা দেখা দিচ্ছে, বাড়ছে দেশে দেশে নদী-বিরোধ এবং জল-সংকট। যেমন লেবানন-ইসরায়েল এর মধ্যে হাসবানি নদীর পানি নিয়ে বিরোধ, তেমনি তুরস্ক-সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে ইউফেটিস নিয়ে, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে গ্যালিলি সাগর নিয়ে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও জর্দানের মধ্যে জর্দান নদী নিয়ে সুদান, মিশর, ইথিওপিয়া ও আরো কিছু দেশের মধ্যে নীলনদ নিয়ে, সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ার মধ্যে সেনেগাল নদী নিয়ে, ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে হেলম্যান্ড নদী নিয়ে আর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে একাধিক নদী নিয়ে বিবাদতো রয়েছেই। তাই আর্ন্তজাতিক যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের নুতন করে ভাবতে হবে। বিশ্বব্যাপি পানি নিয়ে এমন আশংকাজনক পরিস্থিতিতে এবারের বিশ্ব পানি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘পানির মৌলিক অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না’। বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, ‘ফসল উৎপাদনে সেচ কাজে পর্যাপ্ত পানি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের কোনো বিকল্প নেই। পানি ব্যবস্থাপনার ওপর খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল। দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া বাণীতে বলা হয়, জীববৈচিত্র টিকিয়ে রাখতে কৃষি, শিল্পসহ সবক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। জীবন ও পরিবেশের মৌলিক উপাদান পানি। কৃষি, শিল্প, মৎস্য ও পশুপালন, নৌ-চলাচল, বনায়ন ও জীববৈচিত্র পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, উপকূলীয় এলাকার পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, মারাত্মক পরিবেশ দূষণ, পানি প্রবাহে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তন সুপেয় পানির উৎসকে ক্রমশ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশে নিরাপদ পানিয় সংকট তীব্র থেকে তীব্রতার দিকে এগুচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে গ্রামের কিছু কিছু এলাকায় নলকুপে পানি পাওয়া যায় না, অনেক পুকুর খননের অভাবে শুকিয়ে যায়। নদী-নালাগুলো নানা কারণে জলশুন্য হয়ে পড়ে। স্বল্প সংখ্যক পুকুর বা নদী-নালাতে পানি থাকলেও অতিব্যবহার বা নানা অপব্যবহারে পানি এমন দুষণের শিকার হয় তা আর ব্যবহার উপযোগি থাকে না। উপকুলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়াতে এলাকার পানি পানিয় অযোগ্য হয়ে পড়ে আবার পাহাড়ি এলাকায় কাছাকাছি ছড়াগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় পানি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ইনডিপেনডেন্টের সাংবাদিক জোয়ান হারি জলবায়ুবিষয়ক এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, 'বাংলাদেশ : রক্তে যার জন্ম, লবণাক্ত পানিতে তার মৃত্যু'। এমন লেখার কারণ ব্যবহারোপযোগী পানি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এ দেশটিতে। লবণাক্ততা, আর্সেনিক দূষণ আর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সুপেয় পানীয়জলের সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ। আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার নানাধরণের ব্যবস্থা সম্পর্কে সরকারি-বেসরকারি এবং গণমানুষের উদ্যোগ প্রয়োজন। বাড়াতে হবে প্রয়োজনীয় সেচ দক্ষতা। নদীনালা খনন ও বড় বড় জলাশয় তৈরি করার মধ্যদিয়ে পানির উৎস তৈরি করতে হবে। গৃহস্থালি, শিল্প ও কৃষিখাতে পানির অপচয় রোধ করতে হবে। পাশাপাশি ছোটবড় যে কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানে পানি রিসাইক্লিং বাধ্যতামূলক রাখা যায় কিনা সে বিষয়েও ভাবতে হবে। এভাবে বিভিন্ন উপায়ে এবং কার্যকর প্রচেষ্টায় যদি দেশে পর্যাপ্ত পানির সংস্থান সম্ভব হয় এবং পর্যাপ্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা যায় তবেই আমরা মানুষের পানির অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। যদিও বাংলাদেশে এখনো পানির অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে দেখা যায় না। আমাদের দেশে এলাকা ও ঋতুভিত্তিক পানি সমস্যার বিভিন্নধরণের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বড় শহর, ছোট শহর এবং তৃণমূল ও দুর্গম এলাকার মানুষের পানি সমস্যার ধরণ ও প্রকৃতি এক নয়। সুতরাং আমাদেরকে জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী পানি অধিকার নিশ্চিত করতে হলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, উপকূলীয় জনপদ, পার্বত্য এলাকার পাহাড়ি জনপদ, হাওরবাসি, বরেন্দ্র এলাকাসহ সবধরণের মানুষের পানিয় সংকটের ধরণ ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে আলাদা আলাদা পরিকল্পনা গ্রহণ করা বাঞ্চনীয়। এসব এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যাপক সংকট রয়েছে। এসডিজি অর্জনে সকল ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির বিষয়ে জোর দিতে হবে। অন্যথায় স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ নানাধরণের সংকট প্রকট হয়ে উঠবে। বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ঘাসফুল বিশুদ্ধ পানির সংস্থানকল্পে হাটহাজারীতে পিকেএসএফ এর সহযোগিতায় সমৃদ্ধি কর্মসুচি’র মাধ্যমে গত ক’বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে হাটাহাজারীর দু’টি ইউনিয়ন; মেখল ও গুমান মর্দ্দনে স্থানীয়দের চাহিদানুযায়ী ১৪টি গভীর নলকুপ এবং ৬৪টি অগভীর নলকুপ এবং ০২টি সেমি গভীর নলকুপ স্থাপন করা হয়। এ সকল নলকুপ এলাকার হাটবাজার, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির, মক্তব-মাদ্রাসা, ক্লাব, এতিমখানাসহ বিভিন্ন জনবহুল জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মহল্লায় বিশুদ্ধ পানির বিষয়ে সচেতনতামুলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। গ্রামের বেশ কয়েকটি পুকুরের পাড় মেরামত এবং মজবুত করে গাইডওয়াল তৈরি করে দেয়া হয়েছে, যাতে বর্ষায় পর্যাপ্ত পানি ধারণ করে শুস্ক মৌসুমে স্থানীয়রা পানি ব্যবহার করতে পারে। আমাদের ভু-গর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, এলাকায় এলাকায় বিভিন্ন জলাধার সৃষ্টি করাসহ আরো নানাধরণের পানিয় জল সংরক্ষণ কর্মকান্ডের পরিধি বাড়াতে হবে। আমরা মনে করি বিশ্বব্যাপি এই সংকট উত্তরণে সরকারের পাশাপাশি বিশেষ করে গ্রামে-গঞ্জে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোরও যথেষ্ট করণীয় রয়েছে। আমরা আরো বিশ্বাস করি বৃহত্তর পরিসরে নগরকেন্দ্রিক পানিয় সংকট দুরীকরণেও সরকারের ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সাথে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাজ করার প্রচুর সুযোগ ও ক্ষেত্র রয়েছে। এতে প্রয়োজন শুধু কার্যকর পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। বাংলাদেশে কর্মরত দাতা সংস্থাগুলোরও এ বিষয়ে আরো বেশী নজর দেয়া প্রয়োজন। এভাবে সরকারি-বেসরকারি সকল উদ্যোগকে সমন্বিত করে যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করা সম্ভব হয় তাহলে বাংলাদেশের হাওর-বাওর, উপকূল, পাহাড়, সমতল, শহর, গ্রাম, ধনী-দরিদ্র সবক্ষেত্রে চাহিদানুযায়ী নিরাপদ পানিয় জলের সংস্থান করার মধ্য দিয়ে আমাদের পানির অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব এবং সুস্থ, সবল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরিতে তা অত্যন্ত জরুরী।

Topics:

বিশুদ্ধ পানির সংকট

Login to comment login

Latest Jobs